Wednesday, October 14, 2026

প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ আড়াই থেকে তিন বছর করার পরিকল্পনা সরকারের


ফাইল ছবিঃ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা

প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণের মেয়াদ আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) বার্ষিক প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় ছয় গুণ বাড়িয়ে ৪২ হাজারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতিতে দক্ষ করে তোলা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান বাড়াতে প্রশিক্ষণ কাঠামো নতুন করে সাজানো হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষকরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাস সরাসরি প্রশিক্ষণ নেবেন। এরপর বিদ্যালয়ে ফিরে পাঠদানের পাশাপাশি নির্ধারিত পাঠ্যসূচি ও মডিউল অনুযায়ী অনলাইন ও অফলাইনে প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁদের প্রশিক্ষণ মডিউল ও পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করতে হবে।

তবে প্রশিক্ষণব্যবস্থার মেয়াদ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ মডিউলও প্রস্তুত করা হয়েছে। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) এ মডিউল তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এর আওতায় নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা প্রথম দুই মাস পিটিআইতে প্রশিক্ষণ নেবেন। বাকি ১০ মাসের প্রশিক্ষণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইন ও অফলাইনে সম্পন্ন করতে হবে।

পিটিআইগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে প্রায় সাত হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তা বাড়িয়ে ৪২ হাজারে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণে পিটিআইয়ের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগগুলোকেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করার কথা ভাবছে সরকার।

শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও মানসম্মত প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে স্থায়ীভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে নিয়োজিত রাখার বিষয়ে সরকার নীতিগত পরিবর্তন আনতে চায়।

শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ববি হাজ্জাজ জানান, বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু আছে। বাকি উপজেলাগুলোতে কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল যন্ত্র তুলে দেওয়াই এ উদ্যোগের একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।

এ কাজে গুগলসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকার যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন এবং ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকার বিষয়টি তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ জানান, পদোন্নতির আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন আদালতের রায়ের চূড়ান্ত সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার অপেক্ষা রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর আশা, রায়ের চূড়ান্ত অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পথও সহজ হবে এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে।

শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত বইয়ের চাপ কমিয়ে আনন্দমুখর শিক্ষার পরিবেশ তৈরির বিষয়েও কাজ করছে সরকার। প্রতিমন্ত্রী জানান, গল্পের মাধ্যমে পাঠদান এবং গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো কার্যক্রম পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া হাওর, চর ও দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষক সংকট কমাতে বিশেষ ভাতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এসব এলাকার শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সমস্যা দূর করতে প্রয়োজনে আবাসিক বিদ্যালয় চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের পুষ্টি এবং দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপর।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন