- ১২ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করছে ইসরায়েল। নতুন করে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে উপত্যকার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা এখন ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অথবা সেখানে প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। এতে প্রায় ২১ লাখ ফিলিস্তিনিকে গাজার অবশিষ্ট সংকুচিত ভূখণ্ডে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হচ্ছে।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির আওতায় ইসরায়েলি সেনাদের যে সীমারেখা পর্যন্ত পিছু হটার কথা ছিল, সেই ‘ইয়েলো লাইন’ ক্রমেই পশ্চিম দিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জায়গা কমছে, বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট।
রোববার গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শুজাইয়া এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা হলুদ রঙের কংক্রিটের চিহ্নিত ব্লক কয়েক ডজন মিটার পশ্চিমে সরিয়ে নেয়। এর ফলে ওই এলাকার আরও কিছু অংশ ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে নিজেদের বসতি ছেড়ে সরে যেতে বাধ্য হতে হয়।
গাজা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক ইব্রাহিম আল-খলিলি বলেন, বিষয়টি শুধু বর্তমান সীমারেখা কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে নয়; ভবিষ্যতে সেটি আরও কতটা সরানো হতে পারে, সেটিও বড় উদ্বেগের বিষয়। গত তিন বছরে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারগুলোর সামনে এখন কোথায় আশ্রয় নেবে, সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া কার্যত আর কোনো পথ থাকছে না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলার পর গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এরপর থেকে উপত্যকাটিতে বিপুল প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি অভিযানে গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর আগে গাজা উপত্যকার আয়তন ছিল প্রায় ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। প্রায় ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ভূখণ্ডের প্রস্থ ছিল ছয় থেকে ১২ কিলোমিটারের মধ্যে। যুদ্ধের আগেও এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে প্রায় ছয় হাজার মানুষ বসবাস করতেন।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় আগে থেকেই একটি বাফার জোন কার্যকর ছিল। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর ওসিএইচএর ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী, ওই সীমাবদ্ধ এলাকা গাজার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৭ শতাংশ এবং কৃষিজমির ৩৫ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। ২০০৭ সাল থেকে গাজায় স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে অবরোধও কার্যকর রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধে প্রস্তাবিত ২০ দফা পরিকল্পনার আওতায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েলি সেনাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত সরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সীমারেখার মাধ্যমে গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ ভূখণ্ড ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। ফিলিস্তিনিদের জন্য অবশিষ্ট থাকে মাত্র ৪৭ শতাংশ এলাকা, যার আয়তন প্রায় ১৭২ বর্গকিলোমিটার।
২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ দুই বছরের যুদ্ধে ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার তথ্য সামনে আসে। বাস্তুচ্যুতি ও জনসংখ্যার চাপের কারণে গাজার অবশিষ্ট এলাকায় জনঘনত্ব বেড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১২ হাজারে পৌঁছায়।
যুদ্ধবিরতির পরও বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী ‘ইয়েলো লাইন’-এর চিহ্নিত ব্লকগুলো আরও পশ্চিমে সরিয়েছে। পাশাপাশি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনাও উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়েছে।
গবেষণা সংস্থা ফরেনসিক আর্কিটেকচারের হিসাবে, গত বছরের ডিসেম্বর নাগাদ গাজার প্রায় ৫৮ শতাংশ ভূখণ্ড ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। চলতি বছরের মার্চে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোকে ‘অরেঞ্জ লাইন’ নামে আরেকটি সীমারেখার মানচিত্র দেয়। এই সীমারেখার বাইরের একটি এলাকায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করার বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
ওসিএইচএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। অন্যদিকে, জুনে জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, ইসরায়েল নিজেই গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছে।
এর ফলে উপত্যকার প্রায় ২১ লাখ মানুষকে মাত্র ৩৫ শতাংশ এলাকায় বসবাস করতে হচ্ছে। এই অংশের আয়তন আনুমানিক ১২৮ বর্গকিলোমিটার। সেখানে জনঘনত্ব বেড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজার প্রতিটি মানুষের জন্য গড়ে প্রায় ৬১ বর্গমিটার জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে। এই সীমিত জায়গার মধ্যেই বসতি, সড়ক, স্কুল, হাসপাতাল ও কৃষিজমির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ইউএনওস্যাটের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৮২ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, উপত্যকার মাত্র ৩ শতাংশ কৃষিজমি একই সঙ্গে অক্ষত ও ব্যবহারযোগ্য রয়েছে।
ওসিএইচএ বলছে, গাজার অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ এলাকাও আগে থেকেই অতিরিক্ত জনবসতিপূর্ণ। বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন মানবিক সহায়তাকর্মীরা। কিন্তু চলাচলে বিধিনিষেধ ও জায়গার অভাব এ কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ৯ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এমন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন, যেগুলো বৃষ্টির সময় বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে থাকে। তাঁদের বড় একটি অংশ তাঁবু কিংবা অস্থায়ীভাবে তৈরি আশ্রয়ে বসবাস করছেন।
গাজার বিভিন্ন এলাকায় ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছাকাছি যাওয়াও ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমারেখার ওপারের এলাকাগুলোকে ইসরায়েলি বাহিনী এমনভাবে বিবেচনা করে, যেখানে গুলি চালানোর ঝুঁকি রয়েছে। ওই এলাকায় কাছে যাওয়ায় ফিলিস্তিনিদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজাজুড়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সামরিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বাধা সব মিলিয়ে উপত্যকাটির পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।