- ১০ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় ২০০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) যুব নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ’ আন্দোলনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ রাখা হয় এবং কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও স্থগিত করা হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লির কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে বিভিন্ন যানবাহনে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই এলাকায় প্রায় ২০০ জনকে আটক করা হয়েছে। বিক্ষোভে সমর্থন জানানো জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও দিল্লির বাইরে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিক্ষোভের আয়োজন করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি সংগঠন। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এই সংশোধন প্রক্রিয়ার ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনী সুবিধা পেতে পারে।
আন্দোলনকারীদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টায় দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত যন্তর মন্তরে সমবেত হওয়ার কথা ছিল তাঁদের। ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ স্লোগানে আয়োজিত এই কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। তবে আয়োজকেরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথে যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। বাসের যাত্রীদেরও পরীক্ষা করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের প্রতিবন্ধক বসানো হয়। পাশাপাশি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের সরঞ্জামযুক্ত যান মোতায়েন করা হয়।
শহরের কয়েকটি মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ রাখার পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করা হয়। পুলিশ বলেছে, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ভিড় এড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এসব সাময়িক ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মুম্বাইয়ে বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের তরুণ ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে সরকার এতটা উদ্বিগ্ন কেন, তা তাঁর বোধগম্য নয়।
দীপকের অভিযোগ, বিক্ষোভের আগে রেল, মেট্রো, ইন্টারনেট ও সড়কে বিধিনিষেধ আরোপের মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবারই কর্মসূচির অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। সংগঠনের নেতারা অবশ্য শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে পুলিশের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত গত সপ্তাহে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল তালিকা সংশোধনসংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম যাচাইয়ের আওতায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সংখ্যাটি জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে বিজেপি নির্বাচনী সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বিজেপি জেতা কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফলেও নাম বাদ দেওয়ার প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেছে তারা। নির্বাচন কমিশনের প্রধান নিয়োগের প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।
তবে জ্ঞানেশ কুমার এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিজেপির উদ্ধৃত নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যাচাই প্রক্রিয়ার খসড়া পর্যায়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ ব্যক্তি অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি এবং প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ব্যক্তিকে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এসব তথ্য খসড়া সংশোধন পর্যায়ের; পুরো প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ভুলবশত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
ভোটার তালিকা নিয়ে এই বিরোধ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। এর আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগেও আন্দোলন হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা ঘটে।
২০২৭ সালের শুরুতে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর প্রদেশ দেশটির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য, যেখানে বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। এসব নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ, ভোটারদের নাম বাদ পড়ার প্রকৃত কারণ এবং নির্বাচনে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নির্বাচন কমিশন, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদের বক্তব্যে এখনো স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।