Saturday, October 10, 2026

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই রাশিয়া থেকে ডিজেল কিনছেন ট্রাম্প


ছবিঃ ১ অক্টোবর, ২০২৬, বৃহস্পতিবার কলোরাডোর গ্রিনউড ভিলেজে একটি ‘কুইকট্রিপ’ (QuikTrip) স্টেশনের পাম্পে ডিজেল জ্বালানির গ্যালন-প্রতি দাম ইলেকট্রনিকভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে। ( (সংগৃহীত । এপি ছবি/ডেভিড জালুবোস্কি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর নীতির বিপরীতে গিয়ে মস্কো থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জ্বালানির বাড়তি দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোক্তাদের স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে এ সিদ্ধান্তকে ইউক্রেনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাট নেতারা। কিয়েভও এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় এ সমঝোতা হয়েছে। তাঁর ঘোষণামতে, রাশিয়া অবিলম্বে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং তার পরপরই আরও ১০ লাখ টন পাঠানো হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাম্পের এ ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন গত মাসেই রাশিয়ার জ্বালানি খাতের আয় কমিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে দেশটির যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা দুর্বল করতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইউক্রেন দূতাবাসের প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুযায়ী, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘শক্তিশালী অংশীদারদের দুর্বল সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার যখন মিয়ামিতে ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখনই রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের চুক্তির ঘোষণা আসে।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলেনস্কি বলেন, তাঁর দেশের প্রতিনিধিদলকে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আড়াল করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তাঁর মনে হচ্ছে। অংশীদারদের সঙ্গে এমন আচরণ ন্যায্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কংগ্রেসে বিপুল সমর্থনে পাস হওয়া নতুন আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনে—এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। চলতি সপ্তাহেও কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা ইউক্রেনকে সহায়তা দিতে প্রশাসনকে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আহ্বান জানান।

সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার, পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জিন শাহিন এবং ব্যাংকিং কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য এলিজাবেথ ওয়ারেন এক যৌথ প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের ঘোষণাকে ইউক্রেন, ইউরোপীয় মিত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেন।

তাঁরা বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে অর্থায়ন করার পরিবর্তে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রেসিডেন্টের মনোযোগ দেওয়া উচিত।

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বেড়েছে ডিজেলের দাম। শুক্রবার ট্রাম্পের ঘোষণার পর ডিজেল ফিউচারের দাম কিছুটা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ছিল ৬ দশমিক ২৮ ডলার। এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর দাম বেড়ে রেকর্ড ৬ দশমিক ৫২ ডলারে পৌঁছেছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন অটোমোবাইল সংস্থা এএএ।

ট্রাম্প অবশ্য নিষেধাজ্ঞা কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজের ঘোষণায় বিস্তারিত কিছু বলেননি। তিনি জানান, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের পাশাপাশি কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানো তাঁর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

হোয়াইট হাউস থেকে নির্বাচনী সমাবেশে যাওয়ার সময়ও পুতিনকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ তেল আসছে এবং ডিজেলই এখন তাঁদের প্রয়োজন।

রাশিয়া থেকে আসা ডিজেলের মূল্য কে পরিশোধ করবে কিংবা সরবরাহ ঠিক কবে থেকে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি।

শুক্রবার ক্রেমলিন প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পুতিন বলেন, টেলিফোনে আলোচনায় ইউক্রেন সংকটের সমাধানের সম্ভাবনা, ইরানের পরিস্থিতি এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বসহকারে কথা হয়েছে।

পুতিন আরও বলেন, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তেলজাত পণ্য সরবরাহে প্রস্তুত। তাঁর মতে, এ সরবরাহ বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সহকারী ইউরি উশাকভ সাংবাদিকদের বলেননি, ডিজেল সরবরাহের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ছাড় দিয়েছে কি না কিংবা মস্কোকে অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কি না।

চুক্তির সমালোচনা করে জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, রাশিয়া এ সমঝোতার জবাব আরও সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে দিতে পারে। তাঁর মতে, রাশিয়ার জ্বালানি কেনার এ উদ্যোগ যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি করবে।

জেলেনস্কির অভিযোগ, এ সিদ্ধান্ত রাশিয়ার স্বার্থকেই এগিয়ে নেবে। এতে মস্কো আরও বেশি মানুষ হত্যার সুযোগ পাবে, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আরও কম শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আইনের অন্যতম উদ্যোক্তা মার্কিন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে পুতিনের ইউক্রেনবিরোধী যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলছে। কংগ্রেসের দ্বিদলীয় উদ্যোগে পাস হওয়া নিষেধাজ্ঞা আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিনিধি পরিষদের জয়েন্ট ইকোনমিক কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য ডন বেয়ারও এ ঘোষণাকে ক্ষোভজনক বলে অভিহিত করেছেন।

নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনে রাশিয়ার কর্মকর্তা, ব্যাংক এবং তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ছায়া-বহরের ট্যাংকারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ায় নতুন মার্কিন বিনিয়োগ এবং দেশটির সার্বভৌম ঋণসংক্রান্ত লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞার কথাও বলা হয়েছে। রাশিয়ার তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশনাও রয়েছে আইনে, যদিও নির্দিষ্ট শর্তে কিছু দেশের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন রুশ জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি করেনি।

ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় রুশ ডিজেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দিয়ে একটি লাইসেন্স জারির কথা জানায়।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার জ্বালানি পরিবহন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার এ ধরনের লাইসেন্স দিলেও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ক্ষেত্রে এটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। সাধারণত ৩০ দিনের জন্য দেওয়া ছাড়ের পরিবর্তে এবার দীর্ঘ সময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।

লাইসেন্স অনুযায়ী, শুক্রবারের মধ্যে ট্যাংকারে তোলা রুশ ডিজেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় রাশিয়া তার জ্বালানি রপ্তানি থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে—এ পদক্ষেপে সেই বাস্তবতাই আরও স্পষ্ট হয়েছে।

রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্বালানি কৌশলবিদ ক্লেটন সিগল মনে করেন, এ চুক্তির কারণে দামে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তবে রাশিয়া ও পুতিনের জন্য এটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা বয়ে আনবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জ্বালানি ও অর্থনীতি নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান এনার্জি পলিসি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মাইকেল লিঞ্চের মতে, রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল সরবরাহ করা হলে অন্য ক্রেতারা সেই জ্বালানি থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তখন তাঁদের বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে। ফলে বাজারে সরবরাহের ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন না-ও আসতে পারে।

ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জুলাই থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ রেখেছিল মস্কো। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। চলতি মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হতে পারে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারেও ডিজেলের চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন নোভাক।

তবে এই সমঝোতা বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং এর ফলে জ্বালানির দাম ও ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কী প্রভাব পড়ে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন