- ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশটির একাধিক রণাঙ্গনে পাল্টাপাল্টি হামলা, গোলাবর্ষণ ও ড্রোনের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি ভয়াবহ মানবিক সংকটও গভীর হচ্ছে। সাম্প্রতিক লড়াইয়ে সরকারি বাহিনীর আট সেনা এবং তাইজ প্রদেশে ১২ হুথি যোদ্ধা নিহত হওয়ার দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। এদিকে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৩৩ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।
শনিবার লাহিজ প্রদেশের আল-মাকাতিরাহ রণাঙ্গনে তীব্র সংঘর্ষে সরকারি বাহিনীর আট সেনা নিহত হন বলে সরকারপন্থী তুর আল-বাবাহ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।
তাইজ প্রদেশের আল-আকুরুদ এলাকায় সরকারি বাহিনীর দাবি, কয়েক দিনের লড়াইয়ে তারা ১২ হুথি যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তাইজ শহরের উপকণ্ঠে হুথিদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে প্রতিপক্ষের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর কথাও জানিয়েছে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী।
একই প্রদেশের আল-শাকাব রণাঙ্গনে হুথিদের একটি হামলা ঠেকিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে সরকারি সেনারা। এ ছাড়া সরকারপন্থী হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস জানিয়েছে, আল-ওয়াজিয়াহ এলাকায় ড্রোন হামলা চালিয়ে হুথিদের একটি সরবরাহযান ধ্বংস করা হয়েছে। লাহিজ সীমান্তের কাছে আল-মাদারিবাহ এলাকায় হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে নির্ভুল হামলা চালানোর দাবি করেছে সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেড।
এদিকে আল-জাওফ ও মারিব প্রদেশেও হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে সরকারি বাহিনী ও তাদের সহযোগী পপুলার রেজিস্ট্যান্স যোদ্ধারা। সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আল-জাওফে হুথিদের সামরিক অবস্থান, ব্যারাক ও সেনা সমাবেশ লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের কমান্ডকেন্দ্র ও রসদভান্ডারে বিমান হামলা চালিয়েছে। মারিবেও হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে কামান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি পক্ষ।
আকাশপথেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, হাজ্জাহ প্রদেশের আকাশে তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট সৌদি আরবের একটি গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি তুরস্কে তৈরি লেনটেক কারায়েল মডেলের এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর পর এ ধরনের চতুর্থ ড্রোন ভূপাতিত করা হলো।
হুথিরা আরও দাবি করেছে, সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী নাজরান প্রদেশে একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, নাজরানে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি এএইচ-৬আই গোয়েন্দা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে দুই ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন।
হুথি গণমাধ্যমের খবরে আরও বলা হয়েছে, সাদা প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে সৌদি আরব ১০টি বিমান হামলা চালিয়েছে।
এদিকে ইয়েমেনের আল-মুকাল্লা উপকূলের কাছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী একটি ট্যাংকারে সশস্ত্র ব্যক্তিরা হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, একটি ছোট নৌযানে থাকা অন্তত সাতজন অস্ত্রধারী ট্যাংকারটিকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়ে। জাহাজের নিরাপত্তাকর্মীরা সতর্কতামূলক দুটি গুলি ছুড়লে হামলাকারীরা গতিপথ পরিবর্তন করে সরে যায়।
সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি ইয়েমেনে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লড়াই তীব্র হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার মানুষ তাইজ প্রদেশের বাসিন্দা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে জানিয়েছে, তাইজ শহর কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শহরটির ১২টি হাসপাতালে মাত্র চার দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকটের পাশাপাশি অক্সিজেন ও ওষুধের ঘাটতিও তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে কলেরার প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে পূর্ব আফ্রিকাতেও পড়ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে পালিয়ে ৪ হাজারের বেশি শরণার্থী ওই অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ জন জিবুতিতে এবং প্রায় ২০০ জন সোমালিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন।
জিবুতির মার্কাজি শরণার্থী শিবিরেও কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৩১ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর কাছ থেকে গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকাগুলো দখলে নেওয়ার পর হুথিদের সঙ্গে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। হুথিরা আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত এবং ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
হুথিদের অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে। পরে ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে একটি অভিযান চালু করা হয়, যার লক্ষ্য হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল পুনর্দখল করা। এসব এলাকার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে, যা ২০১৪ সালে হুথিরা দখল করেছিল।
সামরিক তৎপরতা বাড়লেও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, হাসপাতালের কার্যক্রম এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয় ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।