Saturday, October 17, 2026

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ভোটার তালিকা সংশোধন ও দিল্লির বিক্ষোভে পুলিশি অভিযানের বিরুদ্ধে আবেদন


ছবিঃ অভিজিৎ দীপকে, CJP-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতীয় আহ্বায়ক, নেহা বোরা (AISA), প্রশান্ত ভূষণ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, প্রকাশ রাজ, অভিনেতা ও কর্মী, Aishe Ghosh (SFI), Viraj (AISF) নিউ দিল্লির প্রেস ক্লাবে মিডিয়াকে সম্বোধন করছেন (সংগৃহীত)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রম এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় আটক, নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগ নিয়ে করা একাধিক আবেদনের বিষয়ে শুনানি শেষে নোটিশ জারি করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আদালত এসব আবেদনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য জানতে চেয়েছেন।

এসআইআর কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ এবং সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে আদালতের এ উদ্যোগ সামনে এল। গত সপ্তাহে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালে বিক্ষোভকারী, সাংবাদিক ও অন্য ব্যক্তিদের আটক করা হয়। তাঁদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে মারধর ও হয়রানির অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশের আচরণের স্বাধীন তদন্ত, ঘটনাস্থল ও সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ এবং জব্দ করা মুঠোফোনসহ ব্যক্তিগত সামগ্রী ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমার আদালতকে জানিয়েছেন, গত ১০ অক্টোবর জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়া ঠেকাতে গোয়েন্দা তথ্য ও পরিস্থিতির পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আদালত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

শুনানিতে বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালার পরিবর্তে বেঞ্চের বিচারপতি জে বাগচি বলেন, জনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় জারি করা নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশের পেছনের কারণ ও পরিস্থিতি আদালত জানতে চান। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের, আইনজীবীদের ও সাংবাদিকদের ওপর পুলিশি হামলার অভিযোগ নিয়েও কেন্দ্রের জবাব চাওয়া হয়েছে।

দিল্লিতে বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগও শুনানিতে উঠে আসে। নেটওয়ার্ক অব উইমেন ইন মিডিয়া, ইন্ডিয়ার (এনডব্লিউএমআই) পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারীদের নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি করার প্রস্তাব দেন। কমিটির প্রধানও একজন নারী হওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত প্রাথমিকভাবে এমন একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। এ বিষয়ে প্রস্তাবিত সদস্যদের নাম গোপন নথির মাধ্যমে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে, দিল্লি ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বিক্ষোভের সময় সাংবাদিকদের মুঠোফোনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। সংগঠনটির আইনজীবী সি ইউ সিং বলেন, এসব সরঞ্জাম সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সাংবাদিকদের কোনো সরঞ্জাম জব্দ করা হয়নি বলে দাবি করেন। আদালত তাঁর বক্তব্য হলফনামার মাধ্যমে নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকদের সরঞ্জাম জব্দ করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন বিচারপতি জে বাগচি।

শুনানিতে নারী সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগ তদন্তের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। প্রধান বিচারপতি বলেন, অভিযোগগুলোর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে কে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন, তাঁদের পেশাগত পরিচয় ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পরিধি নিয়েও আদালত পর্যালোচনা করবেন বলে জানান তিনি।

এক নারী সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের দায়ের করা মামলায় আপাতত কোনো জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।

দিল্লির ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভ ও সমাবেশের নির্ধারিত স্থান হিসেবে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাতী সিংয়ের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নোটিশ জারি করেছেন সুপ্রিম কোর্ট।

আবেদনকারীদের বক্তব্য, প্রতিবাদের স্থান পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য শোনা প্রয়োজন। যন্তর মন্তর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর কাছে হওয়ায় সেখানে সমাবেশের সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এদিকে, ভারতীয় যুব কংগ্রেসও যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছে।

এদিকে, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আগামী ১৬ অক্টোবর বিকেল ৫টায় দিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ শীর্ষক কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। দলের নেতা অশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর অভিযোগে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর পর এ কর্মসূচির ঘোষণা আসে।

কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কনট প্লেস ও যন্তর মন্তর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করার প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, ব্যারিকেড স্থাপন এবং যানবাহন ও বিক্ষোভকারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে অভিজিৎ দীপকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে নির্বাচনী সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, গোয়ায় সিজেপির একটি কর্মসূচিতে হিন্দুত্ববিরোধী স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ঘটনার পর বৃহস্পতিবার দলটির গোয়া শাখা জানিয়েছে, কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন বক্তব্য, স্লোগান কিংবা কর্মকাণ্ডকে তারা সমর্থন করে না।

এর আগে গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্ত ওই স্লোগানদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। সিজেপির গোয়া শাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছে, সব ধর্ম, জাতি ও সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা রয়েছে।

এদিকে, দিল্লির বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও অভিনেতা ইমরান খানকে আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ছাড়ার নোটিশ দিয়েছে মুম্বাই পুলিশ। ওই নোটিশকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি বোম্বে হাইকোর্টে আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তাঁর আইনজীবীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।

সব মিলিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধ, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ ঘিরে ভারতে রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া আবেদনগুলোর পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়গুলোতে আরও অগ্রগতি হতে পারে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন