Monday, October 12, 2026

ভারতের ককরোচ আন্দোলনের নতুন মুখ নেহা বোরা, ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজপথের নেতৃত্বে


ছবিঃ গবেষক ও ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা (সংগৃহীত)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ আন্দোলন। এই আন্দোলনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ২৯ বছর বয়সী গবেষক ও ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। রাজনীতির পরিচিত মুখ না হয়েও নিজের বক্তব্য, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং রাজপথের সক্রিয় উপস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি এখন আন্দোলনকারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন।

ভারতের অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি বোরা সম্প্রতি রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, ভোটারসংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম নির্বাচনী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশন কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিরোধীদের বিরুদ্ধে বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার অভিযোগ তুলেছে।

গত শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল জন্তর মন্তরে যেতে বাধা পেয়ে নতুন কর্মসূচির ডাক দেন বোরা। সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে দিল্লি হাট এলাকায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, সেদিন দিল্লি হাটই হবে জন্তর মন্তর।

এরপর স্লোগান দিতে দিতে ওই স্থানের দিকে এগিয়ে যান তিনি। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন অন্য আন্দোলনকারীরাও। তবে পুলিশ তাঁকে কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে আটক করে।

আটক অবস্থাতেও আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান বোরা। অনলাইনে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, তিনি আটক থাকলেও আন্দোলন থেমে নেই। পুলিশের বাধার মুখে যারা নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাতে পারেননি, তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান থেকেই প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে বলেন তিনি। পরে শনিবারই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান এই আন্দোলনে বোরা একাধিকবার আটক হয়েছেন। প্রতিবার মুক্তি পাওয়ার পর আবারও রাজপথে ফিরে এসেছেন তিনি।

উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ঘেরা অঞ্চলে বেড়ে ওঠা বোরার শৈশব কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় পরিবারকে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। পরে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ও নন্দনতত্ত্ব বিভাগে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নাট্যচর্চা তাঁকে ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা মানুষের জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার সুযোগ করে দেয়। এমনকি যাঁদের সঙ্গে বাস্তব জীবনে মতের অমিল হতে পারে, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান উপলব্ধি করতেও নাটক তাঁকে সাহায্য করেছে।

তবে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পেছনে বড় প্রভাব রেখেছিল ২০১৯ ও ২০২০ সালে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সমালোচকদের অভিযোগ, আইনটি মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক। ওই সময় নিজের প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে নামতে দেখে রাজনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হওয়ার প্রেরণা পান বোরা।

বই, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রে দেখা নানা ধারণাকে শিক্ষার্থীদের বাস্তব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ নিতে দেখেছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাঁকে আন্দোলনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে।

নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন বোরা। গত জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভে অংশ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন তিনি। জন্তর মন্তরে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে সরকারের ভূমিকা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়। এসব বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আরও বেশি মানুষের নজরে আসেন তিনি।

শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম, বেকারত্ব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং নাগরিক অধিকার—এসব বিষয়ও তাঁর আন্দোলনের আলোচনায় উঠে এসেছে। হিন্দি ও ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক বৈষম্য, সাংবিধানিক অধিকার ও সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নকে যুক্ত করেন।

কথাবার্তায় শান্ত স্বভাবের হলেও মাইক্রোফোন হাতে তাঁর বক্তব্য হয়ে ওঠে দৃঢ় ও জোরালো। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।

বোরার মতে, বর্তমান আন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, হতাশা ও মানুষের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিজ্ঞতা এই প্রতিবাদকে শক্তিশালী করেছে। তবে তাঁর কাছে আন্দোলনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো আশা।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভয় যেমন একজনের কাছ থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে, আশাও তেমনি ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে এখন সাহস তৈরি হয়েছে, কারণ তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে প্রতিবাদ করার সাহস তাদেরও আছে।

বোরার ভাষায়, মানুষের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ ও হতাশা সহজে মুছে যায় না। মানুষ অতীতের অভিজ্ঞতা মনে রাখে, আর সেই স্মৃতি একসময় প্রতিবাদের শক্তিতে পরিণত হয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নেহা বোরার উত্থান ভারতের ছাত্ররাজনীতি ও তরুণদের আন্দোলনে নতুন এক অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কতটা রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নির্ভর করবে এর ধারাবাহিকতা, জনসমর্থন এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ওপর।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন