- ১০ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ করতে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বিধিনিষেধ ও শুল্ক-অশুল্ক বাধা দূর করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশি পাটপণ্য ও পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (পিইটি) ফিল্মের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও বিদ্যমান শুল্কসুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা।
গত ৮ ও ৯ অক্টোবর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৬তম সভায় এসব দাবি তুলে ধরা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেয়। শুক্রবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ভারতের স্থলবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, সেগুলো তুলে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ভারতীয় বাজারে পণ্য প্রবেশের পথে বিদ্যমান বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা ও বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা (সাফটা) চুক্তির আওতায় ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কসুবিধা কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতে এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ঢাকা। পাশাপাশি দুই দেশের পণ্যের মান নির্ধারণের নিয়মে সামঞ্জস্য আনা এবং ভারতের ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের (বিআইএস) সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশি পাটপণ্য ও পিইটি ফিল্মের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাবও ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়। এসব শুল্ক ও বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন বলে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকার নয়, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভুটানে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পণ্য পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বাড়বে।
দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে ‘সিইওস ফোরাম’ কার্যকর করার প্রস্তাবও দিয়েছে ঢাকা। ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে বাণিজ্যিক সমস্যা চিহ্নিত করা এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
সীমান্ত দিয়ে পণ্য পরিবহন দ্রুত ও নির্বিঘ্ন করতে ভারতের স্থল কাস্টম স্টেশনগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে প্রবেশপথ ও পার্কিং ইয়ার্ডের উন্নয়ন, গুদাম ও পণ্য রাখার শেড নির্মাণ এবং পণ্য পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টিন সুবিধা বাড়ানো।
বাংলাদেশের মতে, স্থলবন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো ও সেবা উন্নত করা গেলে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব কমানো এবং রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল করা সম্ভব হবে। সীমান্তে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সহজ হওয়াও দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বৈঠকে ভারতও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। বাংলাদেশের কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় তুলার সুতা ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানায় নয়াদিল্লি।
এ ছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানির বাধা দূর করা, বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং আখাউড়া-আগরতলা রুটের কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। দুই দেশের রেল যোগাযোগ উন্নয়ন এবং সীমান্ত হাটের কার্যক্রম নিয়েও মতবিনিময় করেন প্রতিনিধিরা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য এবং বিদ্যমান যোগাযোগব্যবস্থা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাজারে প্রবেশের বাধা, শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা এবং সীমান্তে পণ্য পরিবহনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি।
যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৬তম সভায় উভয় দেশের প্রস্তাব ও উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয়ে কার্যকর সমাধান বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্য পরিচালনা সহজ হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আলোচনায় উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা ভারতের বাজারে কতটা বাড়তি সুবিধা পান।