Monday, October 19, 2026

ভারতে হাসপাতাল পরিচালনায় নতুন মডেল, ৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ পেল ‘ইভেন হেলথকেয়ার’


ছবিঃ ইভেন হাসপাতাল (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার বিকল্প মডেল গড়ে তুলতে ৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে দেশটির স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি স্টার্টআপ ইভেন হেলথকেয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান খোসলা ভেঞ্চারসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সিরিজ-বি তহবিল সংগ্রহের এই পর্বে অংশ নিয়েছে আলফা ওয়েভও। নতুন বিনিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ডলারে, যা ১৮ মাস আগের তুলনায় তিন গুণ।

ইভেন হেলথকেয়ারের দাবি, তাদের লক্ষ্য এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে রোগীর প্রয়োজন ও সুস্থ হয়ে ওঠার ফলাফলই হবে চিকিৎসার প্রধান বিবেচ্য। বর্তমানে ভারতের অনেক হাসপাতালে অতিরিক্ত পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার কিংবা দীর্ঘ সময় ভর্তি থাকার মাধ্যমে আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। রোগীর প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে সব সময় এসব চিকিৎসার সামঞ্জস্য থাকে না বলে মনে করে ইভেন। প্রতিষ্ঠানটি সেই প্রবণতা বদলে চিকিৎসার মান ও রোগীর সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিতে চায়।

সাম্প্রতিক বিনিয়োগের ফলে প্রতিষ্ঠানটির মোট সংগৃহীত মূলধনের পরিমাণ ১২ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। নতুন অর্থ দিয়ে দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরু শহরে আরও পাঁচটি হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। আগামী ছয় মাসের মধ্যে হাসপাতালগুলো চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০২১ সালে মায়াঙ্ক ব্যানার্জি, মাতিলদে জিলিও ও আলেসান্দ্রো ইয়ালঙ্গো মিলে ইভেন হেলথকেয়ার প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি অংশীদার হাসপাতালের মাধ্যমে গ্রাহকদের চিকিৎসাসেবা দিত। তবে রোগীদের এমন কিছু পরীক্ষা করানো হচ্ছে কিংবা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যেগুলো তাদের মতে সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নয় এমন অভিজ্ঞতার পর নিজেদের হাসপাতাল পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠাতা মায়াঙ্ক ব্যানার্জি প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চকে বলেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় রোগীরা অনেক সময় অসন্তোষজনক সেবা পান, অন্যদিকে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চিকিৎসার জন্য তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই সমস্যার সমাধানে নিজেদের হাসপাতাল পরিচালনার পথে এগিয়েছে ইভেন।

প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে বেঙ্গালুরুতে দুটি হাসপাতাল চালু করেছে। ব্যানার্জির ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল দুটি চালুর এক বছরের মধ্যে অবচয় ব্যয় বাদ দিয়ে পরিচালন পর্যায়ে লাভজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। নতুন বিনিয়োগ দিয়ে আরও পাঁচটি হাসপাতাল চালুর পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ইভেনের ব্যবসায়িক মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চিকিৎসকদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ। সাধারণত কোনো কোনো হাসপাতালে বেশি পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচারের সঙ্গে চিকিৎসকদের আয়ের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে ইভেন তাদের চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট বেতন দেয়; কতটি পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচার করা হলো, তার ওপর সরাসরি পারিশ্রমিক নির্ভর করে না।

রোগীর চিকিৎসার ফলাফল ও সুস্থতার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চিকিৎসকেরা অতিরিক্ত বোনাস পেতে পারেন বলে জানিয়েছেন ব্যানার্জি। হাসপাতালের ব্যবস্থাপকদের পারিশ্রমিকও সম্পন্ন হওয়া চিকিৎসাপদ্ধতির সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত নয়। তাঁদের বেতন ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রণোদনা দেওয়া হয়। বিপণন দলের লক্ষ্যও রোগীর চিকিৎসা থেকে কত আয় হবে, তার পরিবর্তে নতুন রোগীকে সেবার আওতায় আনা।

এ ছাড়া চিকিৎসকসহ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ইকুইটি বা মালিকানার অংশ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা করছে ইভেন।

প্রতিষ্ঠানটির আয়ের বড় অংশ আসে রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসার জন্য পাওয়া অর্থ থেকে। পাশাপাশি বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন কমাতে পারলে সেই সাফল্যের বিপরীতেও অর্থ পাওয়ার একটি মডেল নিয়ে বিমা অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

চিকিৎসার কার্যকারিতা মূল্যায়নে ইভেন বিভিন্ন স্বীকৃত চিকিৎসাবিষয়ক স্কোরিং পদ্ধতি ব্যবহার করে। যেমন, হাঁটু প্রতিস্থাপনের পর রোগীর ব্যথা ও চলাফেরার সক্ষমতা পরিমাপে অক্সফোর্ড নি স্কোর ব্যবহার করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে চিকিৎসার ফলাফলের তথ্য প্রকাশ করা হয়, যাতে অন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

ইভেনের দাবি, তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পুনরায় ভর্তি হওয়ার হার ১ শতাংশের কম। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যবস্থায় এই হার ৮ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। তাদের আরও দাবি, রোগীদের হাসপাতালে থাকার সময় গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে এবং এই পদ্ধতির ফলে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫০ কোটি রুপির বেশি সাশ্রয় হয়েছে।

খোসলা ভেঞ্চারসের অংশীদার জয় সাজনানি বলেন, ইভেনের হাসপাতালগুলোর প্রাথমিক কার্যক্রম ও ফলাফল নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বেঙ্গালুরুসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও বেশি পরিবারের কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠানটিকে সহায়তা করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

দ্রুত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থাকলেও আর্থিকভাবে এখনো লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি ইভেন হেলথকেয়ার। নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া আর্থিক নথি অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান ছিল ৯০ কোটি ২০ লাখ রুপি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আয় হয়েছে ২৭ কোটি ২০ লাখ রুপি।

এ ছাড়া গত আগস্টে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩৫০ কর্মীকে ছাঁটাই করেছে বলে ভারতের স্টার্টআপবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনট্র্যাকার জানিয়েছে। ব্যানার্জি কর্মী পুনর্গঠনের বিষয়টি স্বীকার করে সিদ্ধান্তটিকে কঠিন বলে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, চাকরি হারানো কর্মীদের ক্ষতিপূরণ, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাড়তি স্বাস্থ্যবিমা এবং ইকুইটির মালিকানা অর্জনের সময়সীমায় বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ইভেনে প্রায় ৬৫০ জন কর্মী রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন পূর্ণকালীন চিকিৎসক। ব্যানার্জির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সদস্যসংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। ২০২১ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে পরামর্শ, রোগনির্ণয় পরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারসহ রোগীদের সঙ্গে সাত লাখ ৫০ হাজারের বেশি সেবাসংক্রান্ত যোগাযোগ হয়েছে।

ব্যানার্জি জানিয়েছেন, সম্প্রসারণে ব্যয় বন্ধ করলে কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হতে পারে। তবে আপাতত সেই পথে না গিয়ে আরও বেশি রোগীর কাছে পৌঁছানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইভেন। কবে নাগাদ প্রতিষ্ঠানটি লাভের মুখ দেখবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি তিনি।

ভারতের বিশাল স্বাস্থ্যসেবা বাজারে ইভেনের এই মডেল কতটা বিস্তৃত করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে চিকিৎসার মান বজায় রাখা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই হয়ে ওঠার ওপর।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন