Monday, October 19, 2026

সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলে বিপাকে প্রবাসীরা, ভিসা ও চাকরি হারানোর শঙ্কা


ছবিঃ চরম বিপাকে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির জেরে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীরা। ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা অনেকেই নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে যেতে পারছেন না। এতে তাঁদের ভিসার মেয়াদ, চাকরি এবং বিদেশে কর্মজীবন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিকল্প পথে যাত্রার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে বাড়তি ব্যয় ও দীর্ঘ ভোগান্তির মুখেও পড়েছেন।

রোববার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদিগামী একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বিমানবন্দরের টার্মিনালে কারও হাতে বিমানের টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কেউ আবার লাগেজ নিয়ে বসে অপেক্ষা করছেন নতুন কোনো সিদ্ধান্তের। অনেকে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে বারবার খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ ফোনে পরিবারের সদস্যদের পরিস্থিতি জানাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের বাসিন্দা মালেক এক মাসের ছুটি কাটিয়ে সৌদি আরবে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমে তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়। পরে বিকল্প পথে মদিনায় যাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে বলে জানান তিনি।

মালেক বলেন, ইয়েমেন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিস্থিতির কারণে তাঁর আগের টিকিট বাতিল হয়েছিল। এখন দুবাই হয়ে মদিনায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারেন।

কুমিল্লার চান্দিনার মো. শরীফ সরকারের উদ্বেগের কারণ আকামার মেয়াদ। তিন মাসের ছুটি কাটিয়ে সৌদি আরবে ফেরার কথা ছিল তাঁর। রোববার বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, সকাল ১১টার রিয়াদ-দাম্মামগামী ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরে তাঁকে জানানো হয়, রাত সাড়ে ৮টার ফ্লাইটে মদিনা হয়ে দাম্মামে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

শরীফ বলেন, আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তাঁর পক্ষে সৌদি আরবে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় দ্রুত ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত যাত্রা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

নাটোরের বড়াইগ্রামের আতিকুল ইসলাম প্রথমবারের মতো চাকরি নিয়ে সৌদি আরব যাচ্ছেন। গত ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়েছিলেন। রোববার দ্বিতীয়বার এসে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন তিনি। পরিস্থিতি জানতে বাবাকে লাগেজসহ বিমানবন্দরে রেখে গুলশান-২ এলাকায় গালফ এয়ারের কার্যালয়ে যান।

আতিকুলের বাবা আদম আলী বলেন, কৃষিকাজ করে উপার্জিত অর্থ ও সঞ্চয় দিয়ে অনেক আশা নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। ছেলে যেতে না পারলে তাঁর আকামা ও চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। পরে আতিকুল ফিরে এসে জানান, রাত ৮টার ফ্লাইটে বিকল্প পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কুমিল্লার বামনপাড়ার মো. আসাদও ফ্লাইট বাতিলের খবরে বিপাকে পড়েছেন। সৌদি এয়ারলাইনসের রাত ১১টার ফ্লাইটে তাঁর যাওয়ার কথা থাকলেও বাতিলের বিষয়টি আগে জানতে পারেননি বলে জানান তিনি। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মো. মাইনুদ্দীনের সরাসরি ফ্লাইটের পরিবর্তে দুবাই হয়ে মদিনা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে বাড়তি ভাড়া না লাগলেও যাত্রাপথ দীর্ঘ হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি।

নোয়াখালী থেকে আসা সৌদি আরবের রিয়াদপ্রবাসী আব্দুল মান্নানও একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। চার মাসের ছুটি শেষে রোববার তাঁর কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল। আগেই টিকিট কেটে ঢাকায় এলেও বিমানবন্দরে পৌঁছে ফ্লাইট বাতিলের খবর পান।

আব্দুল মান্নান বলেন, নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে সৌদি আরবে তাঁর জরুরি কাজ ও চাকরি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। দ্রুত ফ্লাইটের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য জানানো হলে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমত বলেও মনে করেন তিনি।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী মোট ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এতে ১৮ হাজার ৩৬২ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাতিল বা স্থগিত ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ৫২টি সরাসরি এবং ৬৬টি ট্রানজিট রুটের।

এই পরিস্থিতিতে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকে দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে আটকে গেছেন। আবার কেউ বিকল্প রুটে যাওয়ার চেষ্টা করেও যাত্রার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। বিকল্প ফ্লাইটের টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক চাপও বাড়ছে।

বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) কাওছার মাহমুদ বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা অব্যাহত থাকতে পারে।

যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থার চেষ্টা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের বিনা অতিরিক্ত খরচে সমন্বয় করে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, যেসব যাত্রীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। তবে এই ব্যবস্থায় কতজন যাত্রীর যাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে আসন খালি থাকা ও ফ্লাইট পরিচালনার পরিস্থিতির ওপর।

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান গন্তব্য সৌদি আরব। তাই দেশটিতে ফ্লাইট চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে প্রবাসী কর্মীদের পাশাপাশি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন কর্মী। চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জনে। অর্থাৎ এক বছরে ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

শুধু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে গত বছরের একই সময় পর্যন্ত ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪। চলতি বছরে তা কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন, যা প্রায় ৪৬ শতাংশ কম।

অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরবে গেছেন ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে দেশটি থেকে বাংলাদেশে ৫৮৫ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি।

সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশের জীবিকা নির্ভর করে নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকা ও বৈধ কাগজপত্রের ওপর। তাই ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রা অনিশ্চিত থাকা কর্মীদের জন্য শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়, বরং চাকরি, ভিসা ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন