Sunday, October 18, 2026

উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার, দক্ষতার ঘাটতিতে বাড়ছে সংকট: আইএমএফ


প্রতীকী ছবিঃ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে। সংস্থাটির হিসাবে, দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। শুধু বেকারত্বই নয়, উচ্চশিক্ষা শেষ করা কর্মীদের প্রায় অর্ধেক এমন পেশায় কাজ করছেন, যেখানে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অর্জিত দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে ব্যবধানকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে তরুণদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে থাকলেও উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পরও অনেক তরুণ দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে তাঁদের কেউ কেউ যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ‘স্কিল গ্যাপ’ বা দক্ষতার ঘাটতি বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে আধুনিক কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তার মিল না থাকায় চাকরিপ্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এর ফলে একদিকে শিক্ষিত তরুণদের কর্মজীবন শুরু করতে দেরি হচ্ছে, অন্যদিকে তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত হচ্ছে না।

আইএমএফের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় ৫০ শতাংশ এমন পেশায় নিয়োজিত, যেখানে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও উপযুক্ত চাকরি না পেয়ে অনেককে তুলনামূলক কম দক্ষতানির্ভর কাজে যোগ দিতে হচ্ছে।

এ ধরনের কর্মসংস্থান শ্রমিকের ব্যক্তিগত আয় ও পেশাগত অগ্রগতির ওপর প্রভাব ফেলার পাশাপাশি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাও কমিয়ে দিতে পারে। উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগের পরও সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি না হলে তা জাতীয় মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের আরেকটি দুর্বলতা হিসেবে প্রতিবেদনে অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যাপক উপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে। কৃষি ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করলেও তাঁদের অনেকেরই আনুষ্ঠানিক চাকরির চুক্তি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ নেই। ফলে কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান দিয়ে শ্রমবাজারের প্রকৃত স্থিতিশীলতা ও কাজের মান পুরোপুরি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সামনে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের বড় সুযোগ রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাড়তে পারে।

কর্মক্ষম মানুষের এ বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর সুফল পেতে হলে উৎপাদনশিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং তাঁদের দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।

এই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে জনসংখ্যার কাঠামোগত সুবিধা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। বিপরীতে, কর্মক্ষম তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কাজের ব্যবস্থা না হলে বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা ও হতাশা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কর্মসংস্থানের প্রচলিত কাঠামোয় নতুন চাপ তৈরি করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার যেসব পেশায় এআইয়ের প্রভাব তুলনামূলক বেশি, সেসব ক্ষেত্রে নতুন নিয়োগের চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, এআই-সম্পর্কিত বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে।

প্রযুক্তির এই পরিবর্তন চাকরির বাজারে দক্ষতার ধরন বদলে দিচ্ছে। শুধু প্রথাগত শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের তরুণদের এসব পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারলে বিদ্যমান কর্মসংস্থান সংকট আরও জটিল হতে পারে। এ জন্য শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার এবং কর্মজীবীদের নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব কমাতে শুধু শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; শিক্ষার মান, বাস্তবমুখী দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করাও জরুরি। একই সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন