- ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
দেশের ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর (করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা) খাতে ব্যয় কমেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন—বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলো এ খাতে ব্যয় করেছে ১১৯ কোটি ৪ লাখ টাকা। এর আগের ছয় মাস, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে প্রায় ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের প্রকাশিত জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ের সিএসআর কার্যক্রমবিষয়ক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশে কার্যরত ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে ‘অন্যান্য’ খাতে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বা ২৯ দশমিক ১১ শতাংশ। আর শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ।
পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও অভিযোজন কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। মোট সিএসআর ব্যয়ের ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ এ খাতে ব্যয় করা হয়েছে।
‘অন্যান্য’ খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। এ উপখাতে ব্যাংকগুলো দিয়েছে ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ অর্থের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান এবং শীতপ্রধান অঞ্চলের দরিদ্র ও শীতার্ত মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
এ ছাড়া অন্যান্য উপখাতে ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, অবকাঠামো উন্নয়নে ২ কোটি ২ লাখ টাকা এবং আয়-উৎসারী কার্যক্রমে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে ব্যাংকগুলোর অর্থ মূলত অসচ্ছল, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণে ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন জটিল ও দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্মাণ, পরিচালনা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও এ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষা খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় আগের ছয় মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে তা নেমে এসেছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকায়। ফলে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাংকগুলো এ অর্থ ব্যয় করেছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা খাতেও ব্যয় কমেছে। আগের ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকায়। প্রতিবেদনে এ খাতে ব্যয় কমার হার ৫৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ খাতের আওতায় বৃক্ষরোপণ, পরিবেশবিষয়ক গবেষণা, মৎস্যজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানীয় জল ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী সিএসআর ব্যয়ের বড় অংশ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। দেশে কার্যরত ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩৩টি ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় করেছে ১০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এটি ব্যাংক খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৮৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ছয়টি ব্যাংক ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে দুটি ব্যাংক ব্যয় করেছে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অন্যদিকে, বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংক সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে ১১ লাখ টাকা।
ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ১০টি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে আগের বছরে অর্জিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা থেকে এসেছে মাত্র ৫ লাখ টাকা। বাকি ১৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা এসেছে অন্যান্য উৎস থেকে। অর্থাৎ এসব ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশের উৎস ছিল নিট মুনাফার বাইরে।
অন্যদিকে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের বড় অংশ এসেছে আগের বছরের নিট মুনাফা থেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অর্জিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা থেকে ছয়টি বিদেশি ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এটি তাদের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৯৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যান্য উৎস থেকে এসেছে মাত্র ৮ লাখ টাকা।
ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশে কার্যরত ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিএসআর কার্যক্রমও পর্যালোচনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৮৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৭৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা ৩০ দশমিক ৫১ শতাংশ। পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ৩০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা এবং অন্যান্য খাতে ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কার্যক্রমে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক সিএসআর ব্যয় আগের ছয় মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।