- ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। কক্সবাজার
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর পর টুপটুপ রেস্টু অ্যান্ড রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় সনদ ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্ক করা হলেও সেখানে কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে শারদীয় দুর্গাপূজায় অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।
তিনি বলেন, গত জুনে রিসোর্টটি পরিদর্শন করে অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। এ বিষয়ে নোটিশও দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানান, তিনতলাবিশিষ্ট কাঠের রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ, যেখানে খাবার তৈরি করা হতো। ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। কাঠের তৈরি ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় সনদ না থাকায় এর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় ও উদ্ধার কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাস্থল থেকে নিকটতম ফায়ার স্টেশনের দূরত্ব ছিল প্রায় ২২ কিলোমিটার। খবর পাওয়ার পর কর্মীরা সেখানে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। পরে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণে তৈরি রিসোর্টগুলোর অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মহাপরিচালক। তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রিসোর্ট মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা জানতে চাইলে সুলতানুল আফরীন বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে অনুমাননির্ভর কোনো বক্তব্য দেওয়া ঠিক হবে না। বিস্তারিত তদন্তের পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার পরও কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে এবং দেশের অন্যান্য রিসোর্টের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিসের করণীয় পর্যালোচনা করা হবে। বিদ্যমান আইন ও নজরদারির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পুরান ঢাকায় বারবার অগ্নিকাণ্ড, অনুমোদনহীন কারখানা ও গুদাম এবং বিস্ফোরক পদার্থের ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সরু রাস্তা এবং ভবনগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা না থাকা অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমের বড় বাধা। এসব কারণে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধিবিধান ও বিল্ডিং কোড মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। তবে পুরোনো বসতি ও স্থাপনাগুলোতে একসঙ্গে সব ধরনের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন। এ জন্য সময় প্রয়োজন। অন্যদিকে, নতুন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলতে সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত সচেতন করা হচ্ছে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক। তিনি জানান, সরু রাস্তা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ ধরনের তিন চাকার যান ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি মোটরসাইকেলে হোস পাইপ বহন করে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং আশপাশের ভবনের পানির রিজার্ভারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আগুন নেভানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইনানীর রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার ওপর নিয়মিত নজরদারির বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।