- ২০ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও দাবির প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, অন্যদিকে বিক্ষোভের নামে ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তবে সরকারের বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ। তাঁদের অভিযোগ, আশ্বাস থাকলেও শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি।
রোববার রাতে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, যারা সরকারি-বেসরকারি সম্পদ ধ্বংস করেছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে। আর প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি নষ্ট করার চেষ্টা যারা করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
তবে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারেননি প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপশহর ইভরি-সুর-সেনের ২০ বছর বয়সী তরুণ ইয়ানিস। তাঁর মতে, ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে নতুন কোনো উদ্যোগের স্পষ্ট প্রতিফলন নেই। তিনি বলেন, এটি প্রেসিডেন্টের চেনা ধরনের বক্তব্য, যেখানে বাস্তবায়নযোগ্য কোনো প্রস্তাব নেই। পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহান্তে রাজপথে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
গত সপ্তাহান্তে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংস বিক্ষোভ দেশটির তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী রাজনীতির প্রতি তরুণদের আগ্রহ কমছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই অস্থিরতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট করেছে।
ফ্রান্সের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া জনঅসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী নেতা মারিন লে পেন বিক্ষোভের সময়কার সহিংসতা, লুটপাট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সামনে আনছেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্ন্যু অভিযোগ করেছেন, কট্টর বামপন্থীরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিংসতাকে একধরনের মহড়া হিসেবে ব্যবহার করছে।
ম্যাক্রোঁ দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর আগামী নির্বাচনে আর প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার লড়াইয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের কাছে তরুণ ভোটারদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে দেশটির তরুণরা পরিবর্তন চাইছেন এ বিষয়ে একমত হলেও কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেলিঘ নাবলি, যিনি ইউপিইসি-প্যারিস দ্বাদশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনআইনের অধ্যাপক, বলেন, প্রার্থীদের তরুণদের দাবির বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতেই হবে। তাঁদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্য শুধু আনুষ্ঠানিক হলে চলবে না; তরুণদের প্রত্যাশার বাস্তবসম্মত উত্তর থাকতে হবে।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রথমে উন্নত বিদ্যালয়, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছিল। পরে আন্দোলন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে তরুণদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত বয়স্ক ভোটারদের স্বার্থ ও পেনশনের মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু চলমান আন্দোলন তরুণদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নগুলোকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
নাবলির ভাষায়, এই আন্দোলন না হলে নির্বাচনী প্রচারে তরুণদের দাবি হয়তো আগের মতোই উপেক্ষিত থাকত। কারণ, ষাটোর্ধ্ব ভোটারদের তুলনায় তরুণেরা সাধারণত নির্বাচনে কম সক্রিয় থাকেন।
মেলঁশোঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবোঁমি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন দিয়েছে। দলটির সমালোচকদের অভিযোগ, তারা তরুণদের ক্ষোভ উসকে দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আন্দোলন শুরুর আগেও তরুণ ভোটারদের মধ্যে দলটির সমর্থন ছিল।
শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষকদের বেতন উন্নত করা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির আবেদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মতো দাবিগুলো দলটির কর্মসূচিতে রয়েছে। বিশেষ করে ‘পারকুরসুপ’ নামের অনলাইন ভর্তি আবেদনব্যবস্থা বাতিলের দাবি তরুণদের একটি অংশের মধ্যে সমর্থন পেয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থায় ভর্তি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘লেজ একো’ পত্রিকার জন্য ওপিনিয়নওয়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে মেলঁশোঁর প্রতি সমর্থন ৪৯ শতাংশ। ২০২২ সালের তুলনায় এই হার ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
প্যারিসের ল্যুভর স্কুলের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লিডিয়া বলেন, কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি এবং ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে তিনি ফ্রান্স আনবোঁমিকে ভোট দিতে চান। তাঁর আশঙ্কা, মধ্যপন্থীরা ক্ষমতায় থাকলে ম্যাক্রোঁর নীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
তবে বামপন্থী দলটি ফ্রান্সের সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা দেখছেন না লিডিয়াও। তাঁর মতে, বামঘেঁষা মতামতকেও ক্রমেই চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করাকেও যেন এখন চরম বামপন্থী অবস্থান হিসেবে দেখা হয়।
অন্যদিকে মারিন লে পেন ও তাঁর দল ন্যাশনাল র্যালি বিক্ষোভের সহিংসতাকে আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের অভিযোগ, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং মেলঁশোঁর দল সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছে।
রোববার রাতে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় লে পেন বলেন, দেশের শহর, সড়ক ও জনসম্পদকে ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হতে দেখা গেছে। তাঁর ভাষায়, ফ্রান্স এখন আস্থা ও কর্তৃত্বের গভীর সংকটে রয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সহিংসতা ও সরকারের অসহায়ত্বের মধ্যে দেশটি আটকে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচনী জরিপে লে পেন এখনো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন। তাঁর সমর্থন ৩২ শতাংশ। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে ন্যাশনাল র্যালি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে; এ ক্ষেত্রে দলটির সামনে রয়েছে ফ্রান্স আনবোঁমি।
ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই সামাজিক অসন্তোষ তাঁর সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তাঁর শাসনামলের শুরুতে জ্বালানির ওপর কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরে তা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ধনী ও অভিজাত শ্রেণির প্রতি সরকারের পক্ষপাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য সংকট মোকাবিলা আরও কঠিন হতে পারে। কারণ, বিক্ষোভ প্রশমনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুযোগ আগের তুলনায় সীমিত। গত বছর ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ইউরোপের অন্যতম সর্বোচ্চ হার। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় ঘাটতি ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
ফলে পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে একদিকে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে ব্যয় সংকোচনের কারণে মানুষের ক্ষোভ যাতে আরও না বাড়ে, সেটিও সামলাতে হবে।
এদিকে ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তা নেমে এসেছে ১৫ শতাংশে, যা তাঁর জন্য রেকর্ড সর্বনিম্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রোববারের ভাষণে তিনি সহিংসতার জন্য কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠীর বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন সদস্য ও অপরাধীদের দায়ী করলেও শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে বিস্তারিত কোনো নতুন নীতিগত পদক্ষেপ ঘোষণা করেননি।
এর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী লেকর্ন্যুকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
ফ্রান্সের চলমান পরিস্থিতি এখন শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তরুণদের আস্থা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কে রূপ নিয়েছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই তরুণ ভোটারদের সমর্থন আদায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।