Wednesday, October 21, 2026

অনলাইন হাজিরার পর এবার ১১ ধাপের নজরদারিতে আসছেন প্রাথমিকের শিক্ষকরা


প্রতীকী ছবিঃ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনলাইনে হাজিরা নিশ্চিত করার উদ্যোগের পর এবার বিদ্যালয় তদারকিতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১১ ধাপের বিদ্যালয় পরিদর্শন পদ্ধতি চালু এবং ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই নজরদারির মূল উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষকদের উপস্থিতি যাচাই নয়, বরং শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করা।

সোমবার (২০ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালায় এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ইউনিসেফ যৌথভাবে ‘ফ্রম দ্য ফিল্ড টু রিফর্ম: অ্যাডভান্সিং প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পাঠ্যক্রম, শিক্ষক, তদারকি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এসব ক্ষেত্র পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একদিকে উন্নয়ন ঘটিয়ে অন্য ক্ষেত্রগুলোকে অবহেলা করলে শিক্ষার সামগ্রিক মান বাড়ানো সম্ভব হবে না। তাই মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও মতামতের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যালয় পরিদর্শনব্যবস্থা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায়ে জনবলসংকট এবং কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকায় বিদ্যালয় তদারকি কার্যক্রম আরও কার্যকর করা জরুরি। এ সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে ১১ ধাপের পরিদর্শন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষকদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, সেসব বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়ন, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্টদের মতামতকে সংস্কার পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তা, তদারকি কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে ৬০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় তিন হাজারের বেশি অংশীজনের মতামত ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৭০০-এর বেশি তদারকি কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হয়েছে এবং দেড় হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে।

এসব অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যা, অগ্রাধিকার এবং সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

প্রাথমিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে। ববি হাজ্জাজ জানান, নতুন শিক্ষাক্রমে শিখনফলভিত্তিক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাংলা, গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি খেলনাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা হবে।

এ ছাড়া বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য বরাদ্দ সময়ের বৈষম্য কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নির্ধারণের ওপর জোর দেন প্রতিমন্ত্রী।

শিক্ষকদের দক্ষতা ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানান তিনি। প্রস্তাবিত নীতিমালায় শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক্‌-চাকরি প্রশিক্ষণ, পদায়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মূল্যায়নকে সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বাড়ানো এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পৃথকভাবে পরিচালনা এবং উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।

বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে শুধু ভবন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা শিশুদের উপযোগী হতে হবে। পাশাপাশি নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকিব্যবস্থাকে সমন্বিত করার ওপর জোর দেন তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের শেখার মান উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে।

জাতীয় সংলাপে উঠে আসা সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রতিটি শিশুর প্রকৃত শিখন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ নিশ্চিত করতে পাঠ্যক্রম থেকে শুরু করে শিক্ষক, তদারকি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন