- ১০ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
দেশের মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৪ জন। বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে বাড়তি সুবিধার প্রত্যাশা ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মান ও তার ওপর অভিভাবকদের আস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ৬৮ হাজার ৮২৫ জন। পরের বছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৪৫৬ জনে। ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৭২ হাজার ৭৩৯ জন, ২০২৪ সালে ৭৬ হাজার ৪২ জন এবং ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ৭৯ হাজার ৫৮৯ জন। অর্থাৎ, টানা চার বছর ধরে এ ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে।
অন্যদিকে, দেশের মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক বছরেই কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ জন। ২০২৪ সালে এসব স্তরে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জন। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ জনে। শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০৭ জন।
এর বিপরীতে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ জন। সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থী কমার প্রবণতার মধ্যে এ বৃদ্ধি বিকল্প শিক্ষাধারার প্রতি আগ্রহের বিষয়টি সামনে এনেছে।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশের সর্বত্র সমানভাবে বিস্তৃত নয়। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে দেশে এ ধরনের স্কুল ছিল ১২৩টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৩টিতে।
এর মধ্যে ১৪১টি স্কুল সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ। বাকি দুটি স্কুলের একটি জেলা সদরের পৌরসভা এবং অন্যটি অন্য একটি পৌর এলাকায় রয়েছে। উপজেলা সদরের পৌরসভা কিংবা গ্রামীণ এলাকায় এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নেই।
স্তরভিত্তিক হিসাবে, দেশে এ লেভেল পর্যায়ের স্কুল রয়েছে ৮৫টি, ও লেভেল পর্যায়ের ৪৬টি এবং জুনিয়র পর্যায়ের ১২টি।
সহশিক্ষার ব্যবস্থাও এসব প্রতিষ্ঠানে বেশি প্রচলিত। মোট স্কুলের মধ্যে ১১৮টিতে ছেলে ও মেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৮২ দশমিক ৫২ শতাংশ। আরও ২৪টি স্কুলে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে। একটি স্কুল শুধু ছেলেদের জন্য পরিচালিত হলেও শুধু মেয়েদের জন্য কোনো স্কুল নেই।
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষকতায় নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষক ছিলেন ৭ হাজার ৬৯৭ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ৫ হাজার ৫১৬ জন, যা মোট শিক্ষকের ৭১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
এ লেভেল পর্যায়ে শিক্ষক রয়েছেন ৫ হাজার ৮৬৬ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ৪ হাজার ১৫৪ জন। ও লেভেলে ১ হাজার ৫২১ শিক্ষকের মধ্যে নারী ১ হাজার ১০২ জন। জুনিয়র পর্যায়ে ৩১০ শিক্ষকের মধ্যে নারী ২৬০ জন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে মোট ছাত্রী ছিল ৩৭ হাজার ৬৫৪ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৪৭ দশমিক ৩১ শতাংশ।
স্তরভেদে ও লেভেলে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি। এ পর্যায়ে ১১ হাজার ৫২০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ৬৫১ জন, অর্থাৎ ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এ লেভেলে ৬৪ হাজার ৫৮২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ৩০ হাজার ৫৯১ জন বা ৪৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। জুনিয়র পর্যায়ে ৩ হাজার ৪৮৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ১ হাজার ৪১২ জন, যা ৪০ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সামগ্রিক অনুপাত ১:১০। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন একজন শিক্ষক।
তবে শিক্ষার স্তর অনুযায়ী এ অনুপাতে পার্থক্য রয়েছে। এ লেভেল ও জুনিয়র পর্যায়ে প্রতি ১১ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। ও লেভেলে এ অনুপাত ১:৮।
প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। প্রতিটি স্কুলে গড়ে শিক্ষার্থী ৫৫৭ জন। এ লেভেল পর্যায়ের স্কুলে গড় শিক্ষার্থী ৭৬০ জন, ও লেভেলে ২৫০ জন এবং জুনিয়র পর্যায়ে ২৯১ জন।
ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছেন অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর মধ্যে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্য।
ধানমন্ডির ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুলে তিন সন্তানকে পড়াচ্ছেন এমন এক অভিভাবক জানান, সন্তানদের ইংরেজিতে দক্ষ করে তোলা এবং ভবিষ্যতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করাই তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য। তাঁর বড় ছেলে ইতিমধ্যে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষায় যুক্ত হয়েছেন।
ছেলেকে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অভিভাবক বলেন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী হওয়ায় তাঁর ছেলেকে ভর্তির ক্ষেত্রে আইইএলটিএস কিংবা অতিরিক্ত ইংরেজি কোর্সের সনদ জমা দিতে হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলা মাধ্যম থেকে যাওয়া কিছু শিক্ষার্থীকে এ ধরনের অতিরিক্ত শর্ত পূরণ করতে হয়েছে।
ওই অভিভাবক আরও জানান, তাঁর বড় ছেলে প্রথমে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেকনোলজি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। পরে দুই বছর পর তা ছেড়ে মালয়েশিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিতে যান।
তাঁর বড় মেয়ে বর্তমানে এ লেভেলে পড়ছেন এবং ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ রয়েছে। ভবিষ্যতে বিদেশে পড়ার পরিকল্পনা থাকলেও আপাতত দেশে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবারটি। দেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ বিবেচনায়ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানান ওই অভিভাবক।
পরিবারের ছোট মেয়েকেও একই ধারায় ভর্তি করানোর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বড় দুই সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর পর ছোট মেয়েকেও সেখানে ভর্তি করিয়েছেন, যাতে ভাইবোনদের শিক্ষার ধারায় পার্থক্য তৈরি না হয়।
শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করেন, ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পাঠদানের দক্ষতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি দূর করতে না পারলে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি তাঁদের পেশাগত দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, শুধু শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। তাঁদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, চাকরির মেয়াদ এবং দায়িত্ব পালনের জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকেরা একবার নিয়োগ পাওয়ার পর কর্মদক্ষতা দুর্বল হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘাটতি রয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের সমস্যা দেখা যায় বলে তিনি মনে করেন।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে নিয়োগ চালুর ফলে দুর্নীতির সুযোগ কিছুটা কমলেও পুরো প্রক্রিয়ায় উন্নতির অবকাশ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা যাচাই এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করেই অনেক শিক্ষক নিয়োগ পান।
এ কারণে শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে কার্যকর লাইসেন্স চালু এবং নির্দিষ্ট সময় পর তা নবায়নের ব্যবস্থা করার পক্ষে মত দেন এই শিক্ষাবিদ।
অধ্যাপক নূরে আলম সিদ্দিকীর মতে, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা ও জবাবদিহির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা না গেলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নত করা কঠিন হবে। শিক্ষার মান নিয়ে পরিবারগুলোর আস্থা তৈরি করতে না পারলে আগামী বছরগুলোতে শিক্ষার্থী কমার আশঙ্কাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে এমন কিছু পরিবার সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পাঠাচ্ছে। অন্যদিকে, কিছু পরিবার মাদ্রাসাশিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। এতে প্রচলিত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার কিছু বাস্তব সুবিধা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। এ ধারায় শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে, যা উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে কাজে আসতে পারে। তবে এসব সুবিধা যেন কেবল বিকল্প শিক্ষাধারায় সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির পরিসংখ্যান অভিভাবকদের পরিবর্তিত প্রত্যাশার একটি চিত্র তুলে ধরছে। তবে এই প্রবণতার পেছনে কতটা বিদেশে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা, কতটা কর্মজীবনের প্রস্তুতি এবং কতটা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা কাজ করছে, তা বুঝতে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। শিক্ষার সুযোগ ও মানে বৈষম্য কমিয়ে অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।