- ০৮ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
একটি গুলির শব্দ, রক্তাক্ত এক নারী এবং বাড়িতে ঢুকে পড়া মুখোশধারী ব্যক্তিকে হত্যার দাবি ২০০৮ সালের ৮ মে রাতে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে পুলিশকে এমন ঘটনাই জানিয়েছিলেন থমাস র্যান্ডলফ। শুরুতে ঘটনাটি আত্মরক্ষার দাবি ঘিরে তদন্তের বিষয় হলেও সময়ের সঙ্গে সামনে আসে তাঁর একাধিক বিয়ে, স্ত্রীদের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং জীবনবিমার অর্থ পাওয়ার ঘটনা। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার এই কাহিনি এবার উঠে এসেছে নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র দ্য উইডোয়ার: টিল ডেথ ডু আস পার্ট-এ।
পরিচালক ক্রিস স্মিথের এই তথ্যচিত্রে শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা সন্দেহ, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ‘ডেটলাইন এনবিসি’র প্রযোজক ড্যান স্লেপিয়ান। ২০০৮ সালে শ্যারন কসের মৃত্যুর পর শুরু হওয়া তদন্তের সঙ্গে তিনি প্রায় ১৫ বছর যুক্ত ছিলেন। সেই সময় ধারণ করা ভিডিও ও সাক্ষাৎকারও তথ্যচিত্রটির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
২০০৮ সালের ৮ মে মাদার্স ডে উপলক্ষে রাতের খাবার খেয়ে ষষ্ঠ স্ত্রী শ্যারন কসকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন র্যান্ডলফ। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, শ্যারন ঘরে ঢোকার কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি। ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর একজন মুখোশধারী ব্যক্তিকে দেখে বন্দুক নিয়ে গুলি চালান বলেও দাবি করেন র্যান্ডলফ।
তবে ঘটনাস্থল পরীক্ষা করতে গিয়ে তদন্তকারীদের মনে কয়েকটি প্রশ্ন দেখা দেয়। তদন্তকারী ডিন ও’কেলির সন্দেহ ছিল, মুখোশধারী ব্যক্তির বর্ণনার সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত পুরোপুরি মিলছে কি না। করিডরে গুলি চলার দাবি করা হলেও গুলির খোসা পাওয়া না যাওয়া এবং গুলির শব্দ শোনার পর পুলিশের কাছে ফোন করতে দেরি হওয়ার বিষয়টিও তদন্তকারীদের নজরে আসে।
প্রতিবেশীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাত ৮টা ৩৩ মিনিটের দিকে গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। কিন্তু র্যান্ডলফ পুলিশকে ফোন করেন রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে। এই সময়ের ব্যবধানসহ অন্যান্য অসংগতির কারণে তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে নতুন করে খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।
তদন্তে শ্যারনের মেয়ে কলিন জানান, বিয়ের মাত্র তিন মাসের মধ্যে র্যান্ডলফ তাঁর মায়ের উইলে নিজেকে সুবিধাভোগী হিসেবে যুক্ত করেছিলেন। শ্যারনের নামে ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের জীবনবিমাও করা হয়েছিল। এসব তথ্য সামনে আসার পর তদন্তকারীরা র্যান্ডলফের অতীত সম্পর্ক ও আগের স্ত্রীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।
তদন্তের সূত্র ধরে তাঁরা উত্তর ক্যারোলাইনায় যান মাইক মিলারের পরিবারের কাছে। মিলার ছিলেন র্যান্ডলফের পরিচিত এবং তাঁর সঙ্গে কাজের সম্পর্কও ছিল। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, র্যান্ডলফের সঙ্গে মিলারের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। স্ত্রীকে হত্যার বিষয়ে র্যান্ডলফ একসময় মিলারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
তদন্তকারীদের কাছে তখন স্পষ্ট হতে থাকে, শ্যারনের মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। র্যান্ডলফের আগের বিয়েগুলো এবং সেসব সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মৃত্যুর ঘটনাও অনুসন্ধানের আওতায় আসে।
১৯৭৫ সালে ক্যাথিকে বিয়ে করেছিলেন র্যান্ডলফ। তাঁদের দুই সন্তান ছিল। ক্যাথির নামেও জীবনবিমা করেছিলেন তিনি। পরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয় এবং ক্যাথি অন্যত্র বিয়ে করেন। ক্যাথির নতুন স্বামী স্টিভ থমাস তদন্তকারীদের জানান, র্যান্ডলফ একসময় তাঁকে ক্যাথিকে হত্যার জন্য প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে তাঁর অভিযোগ।
এরপর ১৯৮৩ সালে বেকি গল্টকে বিয়ে করেন র্যান্ডলফ। ক্যাথির সঙ্গে বিচ্ছেদের দিনই বেকিকে বিয়ে করার বিষয়টি নিয়েও পরে আলোচনা হয়। তিন বছর পর ইউটাহতে নিজের বাড়িতে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেকির মরদেহ পাওয়া যায়। প্রথমে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পরে হত্যার সন্দেহ সামনে আসে।
বেকির মৃত্যুর পর তাঁর জীবনবিমা থেকে র্যান্ডলফ পাঁচ লাখ ডলার পেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৮৮ সালে এ ঘটনায় হত্যার অভিযোগে তাঁর বিচার হয়। র্যান্ডলফের বন্ধু এরিক টারান্টিনো আদালতে সাক্ষ্য দেন, বেকিকে হত্যার জন্য তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত র্যান্ডলফ খালাস পান। তাঁর আইনজীবীরা আদালতে বেকির মৃত্যু আত্মহত্যা হয়ে থাকতে পারে এমন যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।
বেকির ঘটনায় খালাস পেলেও পরবর্তী সময়ে র্যান্ডলফের অন্যান্য বিয়ে ও স্ত্রীদের মৃত্যুর তথ্য সামনে আসায় তাঁকে ঘিরে সন্দেহের অবসান হয়নি।
বেকির পর র্যান্ডলফের জীবনে আসেন গেইনাল অলমন। তাঁর নামেও জীবনবিমা করা হয়েছিল বলে জানা যায়। পরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
এরপর ফ্রান্সিসকে বিয়ে করেন র্যান্ডলফ। ফ্রান্সিসের হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে চিকিৎসক নির্বাচনে র্যান্ডলফ ভূমিকা রাখেন। অস্ত্রোপচারের পর ফ্রান্সিসের মৃত্যু হয়। র্যান্ডলফ তাঁর পরিবারকে জানান, চিকিৎসায় ভুলের কারণেই এমন পরিণতি হয়েছে। পরে তিনি জীবনবিমার অর্থ পান এবং হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলাও করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফ্রান্সিসের কাছ থেকে নিজের উইল পড়ে শোনানোর একটি ভিডিও ধারণ করেছিলেন র্যান্ডলফ—এই তথ্যও তদন্তে আলোচনায় আসে।
এরপর লিওনা স্ট্যাপলটনকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের কিছুদিন পর ক্যানসারে লিওনার মৃত্যু হয়।
একাধিক স্ত্রী, তাঁদের মৃত্যু এবং জীবনবিমার অর্থ পাওয়ার ঘটনাগুলোর কারণে র্যান্ডলফের নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ‘ব্ল্যাক উইডোয়ার’ তকমা। তবে তিনি বরাবরই নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে এসেছেন।
শ্যারন কসের মৃত্যুর পর সাংবাদিক ড্যান স্লেপিয়ান তদন্তকারী ডিন ও’কেলির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ঘুরে সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেন। তদন্তের নানা পর্যায়ে ধারণ করা ভিডিও পরে মামলার ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ইউটাহতে তাঁর মায়ের বাড়ি থেকে র্যান্ডলফকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের দৃশ্যও স্লেপিয়ানের ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল। কারাগারে যাওয়ার পরও র্যান্ডলফ তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর ধারণা ছিল, ক্যামেরার সামনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
স্লেপিয়ানের বর্ণনায়, র্যান্ডলফ সন্দেহের মুখে পড়লেও পরিস্থিতির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইতেন। একসময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা একসঙ্গে কুখ্যাত হয়ে যাব।’ র্যান্ডলফের এমন মন্তব্য ও আচরণ তদন্তকারীদের অভিজ্ঞতায় আলাদা গুরুত্ব পেয়েছিল।
তথ্যচিত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ধারণ করা সাক্ষাৎকার, তদন্তের মুহূর্ত এবং র্যান্ডলফের বক্তব্য একত্র করা হয়েছে। এতে একই ঘটনার বিভিন্ন সময়ের বর্ণনা পাশাপাশি রেখে সেগুলোর মধ্যে মিল-অমিল যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শ্যারন কস হত্যার ঘটনায় ২০১৭ সালে র্যান্ডলফের বিচার হয়। হত্যার ষড়যন্ত্র এবং দুটি প্রথম ডিগ্রি হত্যার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
তবে তিন বছর পর নেভাদা সুপ্রিম কোর্ট সেই দণ্ড বাতিল করেন। আদালতের সিদ্ধান্তে বেকি গল্টের পুরোনো মামলার প্রমাণ আগের বিচারে ব্যবহারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ফলে মামলাটি আবার বিচারপ্রক্রিয়ায় ফিরে যায়।
২০২৩ সালে দ্বিতীয় দফার বিচারে তদন্তকারী ডিন ও’কেলি শ্যারনের মৃত্যুর রাতের বিভিন্ন অসংগতি আদালতে তুলে ধরেন। র্যান্ডলফের নিজের তৈরি করা ঘটনার পুনর্নির্মাণের ভিডিওও মামলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত জুরি তাঁকে আবারও দোষী সাব্যস্ত করে। এবার তাঁর সাজা হয় ৬০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ৭১ বছর বয়সী র্যান্ডলফ নেভাদার লাভলক কারেকশনাল সেন্টারে বন্দী রয়েছেন। তিনি এখনো নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর একটি আপিলও খারিজ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
র্যান্ডলফের কাহিনিতে ক্যামেরার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে তিনি সাংবাদিকের ক্যামেরাকে দেখলেও, বছরের পর বছর ধরে ধারণ করা সেই ভিডিওগুলো শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও মামলার ঘটনাপ্রবাহ নথিবদ্ধ করার উপকরণ হয়ে ওঠে।
একটি স্ত্রীর মৃত্যুর তদন্ত দিয়ে শুরু হওয়া অনুসন্ধান ধীরে ধীরে উন্মোচন করে একাধিক বিয়ে, জীবনবিমা, পুরোনো অভিযোগ এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার ইতিহাস। নেটফ্লিক্সের দ্য উইডোয়ার: টিল ডেথ ডু আস পার্ট সেই ঘটনাগুলোকে এক সূত্রে গেঁথে দেখিয়েছে কীভাবে সময়ের সঙ্গে একটি মামলার পরিধি বাড়তে পারে এবং পুরোনো ঘটনা নতুন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।