Wednesday, October 14, 2026

অসুস্থ শরীরেও থামেনি সংগীতের টান, যেভাবে শেষ হয়েছিল নুসরাত ফতেহ আলী খানের জীবন


ফাইল ছবিঃ নুসরাত ফতেহ আলী খান (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

কাওয়ালির সুরে বিশ্বজুড়ে কোটি শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছিলেন নুসরাত ফতেহ আলী খান। তাঁর কণ্ঠে সুফি সংগীত পেয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর গান পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। পশ্চিমা সংগীতশিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব অবস্থান। অথচ জীবনের শেষ অধ্যায়ে গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে এই কিংবদন্তি শিল্পীকে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সংগীতের প্রতি তাঁর টান ছিল অটুট।

১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনের ক্রমওয়েল হাসপাতালে মারা যান নুসরাত ফতেহ আলী খান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৪৮ বছর। কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। কিন্তু সেই যাত্রা আর সম্পূর্ণ হয়নি।

কাওয়ালি পরিবেশনায় নুসরাতের বিশেষত্ব ছিল দীর্ঘ সময় ধরে গেয়ে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা, কণ্ঠের বৈচিত্র্য এবং তালের ওপর নিয়ন্ত্রণ। মঞ্চে তাঁর পরিবেশনা শ্রোতাদের আবেগাপ্লুত করত। তবে জীবনের শেষ দিকে অসুস্থতা তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছিল। কিডনির সমস্যার কারণে তাঁকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছিল।

পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী সালমান আহমেদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে, মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে নুসরাতের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালমান জানান, সেদিন শিল্পীকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, শারীরিকভাবে তিনি ভালো নেই। অসুস্থতা সত্ত্বেও কাজের ব্যস্ততা কমেনি নুসরাতের।

সালমানের ধারণা হয়েছিল, নুসরাতের কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সংগীতের কাজ থেকে বিরতি নেওয়ার সুযোগ আর পাননি তিনি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।

১৯৯৭ সালের আগস্টে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল নুসরাত ফতেহ আলী খানের। কিডনির জটিলতার চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল। তবে যাত্রাপথে লন্ডনে যাত্রাবিরতির সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

৯ আগস্ট তাঁকে লন্ডনের ক্রমওয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিডনির সমস্যার পাশাপাশি লিভারের জটিলতাও ছিল তাঁর। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও হেপাটাইটিসে আক্রান্ত থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা চালিয়ে গেলেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত আর বাস্তবায়িত হয়নি।

১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট ভোরে নুসরাতের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরদিন প্রকাশিত পাকিস্তানি সংবাদপত্র ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন ভোর চারটার দিকে তাঁর অবস্থার অবনতি শুরু হয়। পরে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।

চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট সকাল ১১টা ৫৭ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয়। কিডনি ও লিভারের জটিলতাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে ছিলেন ব্যবস্থাপক হাজি ইকবাল নকভি, সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াঁদাদসহ কয়েকজন ঘনিষ্ঠজন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সংগীতজগতে শোকের ছায়া নেমে আসে।

নুসরাতের জীবনের শেষ সময় নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁর ভাতিজা ও সংগীতশিল্পী রাহাত ফতেহ আলী খান। ২০২৫ সালে প্রকাশিত দ্য নেশন-এর একটি প্রতিবেদনে রাহাতের সেই স্মৃতির কথা উঠে আসে।

রাহাতের বর্ণনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দরের পথে গাড়িতে নুসরাতকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল। তবে শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও নতুন অ্যালবামের কাজ নিয়ে ভাবছিলেন তিনি। গাড়িতে সেই অ্যালবামের রেকর্ডিং চালিয়ে শুনেছিলেন বলেও স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করা হয়।

ঘটনাটি নুসরাতের সংগীতের প্রতি গভীর নিষ্ঠার একটি দিক তুলে ধরে। অসুস্থতা, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা এবং শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও সৃষ্টিশীল কাজ তাঁর ভাবনার বাইরে চলে যায়নি।

নুসরাত ফতেহ আলী খানের জীবন থেমে গেছে ১৯৯৭ সালে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে কাওয়ালি ও সুফি সংগীতের যে বৈশ্বিক পরিচিতি তৈরি হয়েছিল, তা আজও অমলিন। তাঁর গান প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতাকে আকৃষ্ট করছে। আর সে কারণেই মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও সংগীতপ্রেমীদের কাছে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, কাওয়ালির এক অনন্য প্রতীক।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন