- ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
মালয়ালম সিনেমার ক্রাইম থ্রিলার মানেই রহস্য, টানটান উত্তেজনা আর তদন্তের জটিল সব বাঁক। গত এক দশকে এই ধারার বেশ কিছু সিনেমা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। তবে পুলিশি তদন্তনির্ভর থ্রিলারের প্রসঙ্গ উঠলেই আলোচনায় আসে জিতু জোসেফ পরিচালিত ‘দৃশ্যম’। এবার সেই জনপ্রিয় সিনেমার সঙ্গে তুলনায় উঠে এসেছে নতুন মালয়ালম থ্রিলার ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’। প্রেক্ষাগৃহে সাড়া ফেলার পর সিনেমাটি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়ায় নতুন করে দর্শকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
শাহাদ পরিচালিত সিনেমাটি গত মাসে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। পরে ৯ অক্টোবর থেকে এটি নেটফ্লিক্সে দেখা যাচ্ছে। প্রায় দুই ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের এই ক্রাইম থ্রিলারে অভিনয় করেছেন পার্বতী থিরুভোথু, বিজয়ারাঘবন, সিদ্ধার্থ ভরতন, ম্যাথু থমাস, বিনয় ফোর্ট ও উন্নিমায়া প্রসাদ।
সিনেমাটির নামের অর্থ দাঁড়ায় ‘প্রথম দৃষ্টিতে অপরাধী’। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গল্পের মূল প্রশ্ন কাউকে অপরাধী মনে হলেই কি তিনি সত্যিই অপরাধী? নাকি ঘটনার আড়ালে রয়েছে এমন বাস্তবতা, যা প্রথম দেখায় বোঝা যায় না?
সিনেমার শুরুতে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মক্ষেত্রের পরিচয় তুলে ধরা হয়। প্রথমদিকে এই অংশ কিছুটা দীর্ঘ মনে হতে পারে। তবে গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়, চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা ও পারিবারিক পরিস্থিতি কাহিনির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গল্পের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র আলিনা, যাঁর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পার্বতী থিরুভোথু। স্বামীকে হারানোর পর ছোট মেয়েকে নিয়ে জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর পুলিশের চাকরিতে যোগ দিয়ে নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব নিতে আসেন আলিনা। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় জ্যেষ্ঠ কনস্টেবল দিব্যার সঙ্গে। দিব্যার ভূমিকায় রয়েছেন উন্নিমায়া প্রসাদ।
অন্যদিকে দাসন ও শ্রীনাথের জীবনেও চলছে পরিবর্তনের অপেক্ষা। তাঁদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সিদ্ধার্থ ভরতন ও ম্যাথু থমাস। চার পুলিশ কর্মকর্তার জীবন একপর্যায়ে এমন একটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়, যার পরিণতি তাঁদের কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সেখান থেকেই শুরু হয় গল্পের আসল টানাপোড়েন।
‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’-এর সঙ্গে ‘দৃশ্যম’-এর তুলনা হওয়ার অন্যতম কারণ অপরাধের পরিণতি মোকাবিলায় চরিত্রগুলোর লড়াই। ‘দৃশ্যম’-এ জর্জকুট্টি নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে বুদ্ধি ও পরিকল্পনার আশ্রয় নেয়। নতুন সিনেমাটিতে অবশ্য তেমন কোনো সর্বক্ষণ হিসাব কষে চলা চরিত্র নেই।
এখানে মূল চরিত্রগুলো সাধারণ মানুষ এবং তাঁদের সিদ্ধান্তেও রয়েছে ভুলের ছাপ। নিজেদের কাজের পরিণতি সম্পর্কে তাঁরা সচেতন হলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো দক্ষতা তাঁদের নেই। ফলে একটি ভুলের প্রভাব ক্রমেই বড় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সামনে আসে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও আইনের সীমারেখা নিয়ে জটিল প্রশ্ন।
সিনেমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দর্শককে সব সময় একই দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনা দেখানো হয় না। কোনো চরিত্রের অবস্থান থেকে দেখা ঘটনা অন্য চরিত্রের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন রহস্যকে আরও জটিল করে তোলে।
কাহিনির একপর্যায়ে প্রবেশ করেন অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা হ্যারিস মিরান। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন বিজয়ারাঘবন। নিয়ম মেনে তদন্ত করা, অপরাধের সূত্র খুঁজে বের করা এবং নিজের পেশাগত দক্ষতার ওপর আস্থা রাখা সব মিলিয়ে তিনি প্রচলিত পুলিশি থ্রিলারের পরিচিত গোয়েন্দা চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তবে তদন্ত যত এগোয়, তাঁর দৃঢ় অবস্থানেও পরিবর্তন দেখা যায়। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অহং, পদমর্যাদা ও অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। একদিকে ভুল করে বিপাকে পড়া কয়েকজন পুলিশ সদস্য, অন্যদিকে অভিজ্ঞ ও দক্ষ তদন্তকারী এই দুই পক্ষের সংঘাত সিনেমার উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
পরিচালক শাহাদ তাঁর আগের কাজের তুলনায় এ সিনেমায় নির্মাণশৈলীর আরও পরিণত প্রয়োগ দেখিয়েছেন। প্রায় তিন ঘণ্টার কাছাকাছি দৈর্ঘ্য থাকা সত্ত্বেও গল্পের রহস্য দর্শককে বেশির ভাগ সময় আটকে রাখে। যদিও কিছু জায়গায় কাহিনি এগিয়ে নিতে সুবিধাজনক পরিস্থিতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, তবু সামগ্রিক উত্তেজনায় বড় ধরনের ছেদ পড়ে না।
চিত্রনাট্যে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, থানার ভেতরের টানাপোড়েন এবং তদন্তের বিভিন্ন ধাপের পাশাপাশি হাস্যরসও রাখা হয়েছে। এতে গম্ভীর কাহিনির মধ্যে কিছুটা স্বস্তি আসে। একটি চরিত্রের লেখা বইকেও রহস্যের সূত্র উন্মোচনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, যা গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে পার্বতী থিরুভোথু বিশেষভাবে নজর কাড়েন। নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, ব্যক্তিগত শোক সামলানো এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে তাঁর চরিত্রের যে দ্বন্দ্ব, তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। অন্যদিকে বিজয়ারাঘবন অভিজ্ঞ তদন্তকারী হিসেবে পর্দায় দৃঢ় উপস্থিতি তৈরি করেছেন।
মালয়ালম ক্রাইম থ্রিলারের পরিচিত কাঠামোর মধ্যে থেকেও ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ নিজস্ব গল্প বলার চেষ্টা করেছে। এখানে শুধু কে অপরাধ করেছে, তা জানাই মুখ্য নয়; বরং কেন একটি ভুল ঘটে, সেই ভুলের দায় কার এবং আইনের প্রয়োগে নৈতিকতার জায়গা কোথায় এসব প্রশ্নও গুরুত্ব পেয়েছে।
‘দৃশ্যম’-এর সঙ্গে তুলনা করে সিনেমাটিকে বিচার করার সুযোগ থাকলেও দুটির গল্প বলার ধরন ও চরিত্রের সংকট আলাদা। তাই কোনটি ভালো, সেই বিতর্কের চেয়ে নতুন সিনেমাটিকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। রহস্য, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও পুলিশি তদন্তনির্ভর গল্প যাঁদের পছন্দ, তাঁদের জন্য ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ হতে পারে নেটফ্লিক্সে দেখার মতো একটি সিনেমা।