- ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আসন্ন নির্বাচনের আগে একজোট হয়েছেন দেশটির পাঁচ বিরোধী নেতা। গত ২৬ সেপ্টেম্বর তেল আবিবে এক বৈঠকে তাঁরা পারস্পরিক অনাক্রমণ চুক্তিতে সই করেন। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিকল্প সরকার গঠনই তাঁদের মূল লক্ষ্য। তবে আদর্শগত মতপার্থক্য এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থানের কারণে এই জোট কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদের বাসভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অংশ নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট, ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান এবং ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির প্রধান আভিগদর লিবারম্যান। লাপিদ ও বেনেটের নেতৃত্বাধীন বেয়াহাদ জোটের পাশাপাশি অন্য নেতারাও নেতানিয়াহুবিরোধী রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে তুলতে সম্মত হন।
বৈঠকের পর প্রকাশিত নীতিগত ঘোষণায় নেতারা বলেন, তাঁদের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও ইসরায়েল পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে একটি জায়নবাদী ও দায়িত্বশীল সরকার গঠন তাঁদের অভিন্ন লক্ষ্য।
তবে এই ঐক্য কত দিন টিকবে, ভবিষ্যৎ জোট সরকারের নেতৃত্ব কে দেবেন এবং ক্ষমতায় গেলে নীতিগতভাবে কতটা পরিবর্তন আসবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে লিবারম্যান অভিযোগ করেছেন, আইজেনকট নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন। ফলে বিরোধীদের ঐক্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিরোধী শিবিরে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। ৬৬ বছর বয়সী এই রাজনীতিক ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ছিলেন। ২০২২ সালে বেনি গান্টজের ন্যাশনাল ইউনিটি জোটের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। পরে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর নেতানিয়াহুর গঠিত যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় তাঁর ছেলে গাল এবং দুই ভাতিজা নিহত হন। ২০২৪ সালের জুনে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে নেতানিয়াহুর সুস্পষ্ট কৌশল না থাকার অভিযোগ তুলে গান্টজের সঙ্গে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা ছাড়েন আইজেনকট।
পরের বছর তিনি মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টি গঠন করেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পেশাদার সরকার প্রতিষ্ঠা, অতি-অর্থোডক্স ইহুদিসহ সবার জন্য সামরিক সেবার বাধ্যবাধকতা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠন।
তবে ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে তাঁর অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন না তুললেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার সমালোচনা করেছেন তিনি। নির্বাচনের পর আরব দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা'আমকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন আইজেনকট।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ চলতি বছরের এপ্রিলে বেয়াহাদ বা ‘একসঙ্গে’ নামে যৌথ নির্বাচনী জোট গঠনের ঘোষণা দেন। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দুই নেতা পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
৫৪ বছর বয়সী বেনেট দীর্ঘদিন ধরে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের সমর্থক। জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ৬২ বছর বয়সী লাপিদ মধ্যপন্থী ইয়েশ আতিদ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে বিবেচিত হচ্ছে, তা নিয়ে লাপিদ সমালোচনা করলেও এসব অভিযানের মূল যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি সাধারণত প্রশ্ন তোলেননি। বেনেট আরও কট্টর অবস্থানের জন্য পরিচিত এবং ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের জোরালো সমর্থক।
দুই নেতা এখন কেবল জায়নবাদী দলগুলোর সমন্বয়ে সরকার গঠনের পক্ষে। তাঁদের পরিকল্পনায় আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করার বিষয়টিও বাদ দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির প্রতিষ্ঠাতা আভিগদর লিবারম্যান বিরোধী নেতাদের মধ্যে নিরাপত্তা প্রশ্নে সবচেয়ে কট্টর অবস্থানের জন্য পরিচিত। ১৯৯৯ সালে রুশভাষী ডানপন্থী অভিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্য নিয়ে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী থাকলেও এখন তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের অংশ হতে রাজি নন লিবারম্যান। একই সঙ্গে অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর অংশগ্রহণ কিংবা আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠনেরও বিরোধিতা করেন তিনি। এ অবস্থান আইজেনকটকে বিরোধী জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, নেতানিয়াহুর প্রতি ব্যক্তিগত বিরোধিতাই লিবারম্যানকে এই জোটে রেখেছে। তবে তাঁর নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাঁকে উপেক্ষা করাও কঠিন। পরিস্থিতি বদলালে তিনি আবার নেতানিয়াহুর ডানপন্থী শিবিরে ফিরে যেতে পারেন—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পর্যবেক্ষকেরা।
পাঁচ নেতার মধ্যে ইয়ার গোলানকে তুলনামূলকভাবে বামপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ও মধ্য-বামপন্থী মেরেতজের একীভবনের মাধ্যমে গঠিত হয়। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলান ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে অন্য নেতাদের তুলনায় বেশি আগ্রহী।
গাজার যুদ্ধ নিয়ে সরকারের লক্ষ্য ও কৌশলের সমালোচনাও করেছেন তিনি। তবে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁর অবস্থান এবং আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সীমা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে আরব বালাদ পার্টির নেতা সামি আবু শেহাদেহকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করায় সমালোচনার মুখেও পড়েন গোলান।
লন্ডনের কিংস কলেজের ইসরায়েল-বিষয়ক বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, বিরোধী জোটের প্রভাবশালী নেতারা মূলত ডানপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর ভাষ্য, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে তাঁদের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য মূলত নেতৃত্বের ধরন, দুর্নীতির অভিযোগ এবং কট্টর ডানপন্থীদের ওপর নির্ভরতার প্রশ্নে।
বিরোধী নেতারা নেতানিয়াহুকে সরানোর বিষয়ে একমত হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে ঐকমত্য নেই। গোলানের দল এ লক্ষ্যকে দূরবর্তী সম্ভাবনা হিসেবে স্বীকার করলেও অন্য নেতারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে স্পষ্ট অঙ্গীকার করেননি। গাজার যুদ্ধকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকার করা কিংবা লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, কাতার ও ইরানে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে মৌলিক আপত্তি তোলার ক্ষেত্রেও তাঁদের অবস্থান সীমিত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জোটের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ শুধু নির্বাচনে আসন বাড়ানো নয়; বরং পারস্পরিক মতপার্থক্য সামলে সরকার গঠন এবং পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা ধরে রাখা। এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসরায়েলি রাজনীতি-বিশেষজ্ঞ রয় জুরের মতে, লিবারম্যান ও গোলান—দুই নেতার সমর্থন ছাড়া বিজয়ী জোট গঠন কঠিন হতে পারে। নিরাপত্তা ও সংঘাত নিয়ে তাঁদের মতভেদ থাকলেও ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক সেবায় ছাড় দেওয়ার বিরোধিতার মতো বিষয়ে মিল রয়েছে।
আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন তাই শুধু নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কোন রাজনৈতিক সমীকরণে গঠিত হবে, সেটিও স্পষ্ট করবে। তবে বিরোধীদের ঐক্য ক্ষমতার পরিবর্তন আনলেও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়ে ইসরায়েলের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।