Saturday, October 17, 2026

মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল, গুরুত্ব হারাচ্ছে মানবাধিকার


ছবিঃ শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে তুর্কমেনিস্তানে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস (সিআইএস) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে) ও উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়য়েভ একে অপরকে সম্ভাষণ জানান; তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গেও সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ( (সংগৃহীত । আল জাজিরা / গাভরিল গ্রিগরভ, স্পুটনিক, ক্রেমলিন পুল ফটো, এপি-এর সৌজন্যে)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

মধ্য এশিয়ায় নিজেদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা কিংবা রাজনৈতিক সংস্কারের শর্ত সামনে না রেখে অর্থনৈতিক স্বার্থ, সামরিক কৌশল ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এই নীতিগত পরিবর্তনের মধ্যেই উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর সমরকন্দে পৌঁছানোর কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর।

শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় ‘সি৫+১’ সম্মেলনে মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ—কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে সম্মেলনটিকে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও চীনের প্রভাববলয়ের মধ্যে অবস্থিত মধ্য এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করাই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ার দেশগুলো যখন অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কূটনীতিক এবং ব্যবসায়ীরা সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কার, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়গুলোও পশ্চিমা দেশগুলোর আলোচনায় গুরুত্ব পেত।

সেই সময় পশ্চিমা দেশগুলো আঞ্চলিক নেতাদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিত—বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে হলে সোভিয়েত আমলের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা থেকে সরে আসতে হবে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে আয়োজন করা হতো বিভিন্ন কর্মশালা ও আলোচনা। শিক্ষার্থী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের পশ্চিমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়ানো এবং আত্মীয়স্বজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দেওয়া হয়।

উজবেকিস্তানে জন্ম নেওয়া এবং বর্তমানে মলদোভায় অবস্থানরত আঞ্চলিক বিশ্লেষক গালিয়া ইব্রাগিমোভা আল জাজিরাকে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো যখন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে নীতিকথা শোনাতে শুরু করে, তখন মধ্য এশিয়ার নেতারা দ্রুত চীন কিংবা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন।

মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দেশ উজবেকিস্তানের অতীত ঘটনাপ্রবাহ পশ্চিমা নীতির প্রভাব বোঝার একটি উদাহরণ। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ইসলাম করিমভ ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে উজবেকিস্তানের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৫ সালে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় আন্দিজান শহরে একটি গণঅভ্যুত্থান কঠোরভাবে দমনের ঘটনায় শত শত নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার সমালোচনা করে ওয়াশিংটন। এরপর করিমভ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

একই সময়ে করিমভের মেয়ে গুলনারার বিরুদ্ধেও প্রভাব খাটিয়ে লাভজনক ব্যবসা দখলের অভিযোগ সামনে আসে। ফাঁস হওয়া একটি মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাঁকে ‘রবার ব্যারন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। একসময় তাঁকে বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও বিবেচনা করা হতো।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর মধ্য এশিয়ায় মস্কোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, নাট্য উৎসব এবং রুশ গণমাধ্যমের মাধ্যমে অঞ্চলটিতে দেশটির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এখনো শক্তিশালী।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ‘রুশ বিশ্ব’ ধারণার মাধ্যমে মধ্য এশিয়াকে রাশিয়ার নিকটবর্তী প্রভাববলয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও করছে ক্রেমলিন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০১৪ সালে দাবি করেছিলেন, কাজাখস্তানের আগে কখনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল না। দেশটির রুশভাষী উত্তরাঞ্চল দখল করে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি।

চলতি বছর কাজাখস্তান রাশিয়ায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে এবং ক্রেমলিনের সমালোচকদের প্রত্যর্পণের পদক্ষেপ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জানুয়ারিতে রুশ রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের উপস্থাপক ভ্লাদিমির সলোভিয়ভ মধ্য এশিয়া ও আর্মেনিয়ায় ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালানোর প্রস্তাব দেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একই পরিভাষা প্রয়োগ করে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এদিকে মধ্য এশিয়ার বহু শ্রম অভিবাসীকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে অথবা বাধ্য করে ইউক্রেন যুদ্ধে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলটির বিভিন্ন কোম্পানিকে ব্যবহার করে রাশিয়া মাইক্রোচিপ, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করছে, যা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ইব্রাগিমোভার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ভূমিকা যেন উল্টে গেছে। আগে পশ্চিমা দেশগুলো গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলত, আর এখন রাশিয়াই নীতিকথা শোনানোর মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ওপর আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মধ্য এশিয়ায় ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থানকে তাঁরা মূলত লেনদেননির্ভর ও বাস্তব স্বার্থকেন্দ্রিক হিসেবে দেখছেন।

ইব্রাগিমোভা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মধ্য এশিয়ায় সম্পর্কের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে ব্যবসা ও পারস্পরিক স্বার্থ। মানবাধিকার কিংবা সংস্কার নিয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর আগ্রহ তাদের কম।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প উজবেক প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভের মেয়ে সাইদা মিরজিয়োয়েভাকে অভ্যর্থনা জানান। এর এক বছর আগে মিরজিয়োয়েভ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ উজবেকিস্তান নিজেও বিশ্বের অন্যতম বড় তুলা উৎপাদনকারী দেশ।

মিরজিয়োয়েভ সরকারের সমালোচকদের ওপর দমন-পীড়ন এবং তাঁর মেয়ের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো সমালোচনা করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মধ্য এশিয়া তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেলেও এবার অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্সের প্রধান আলিশের ইলখামভের মতে, রাশিয়া ও চীনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকায় মধ্য এশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অঞ্চলটিকে সামরিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

ইলখামভের ধারণা, ভবিষ্যতে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মধ্য এশিয়ায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টিও ওয়াশিংটনের বিবেচনায় থাকতে পারে।

মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আগ্রহের অন্যতম ক্ষেত্র বিরল মৃত্তিকা খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আধুনিক প্রযুক্তি তৈরিতে এসব খনিজের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। অঞ্চলটিতে এ ধরনের খনিজের মজুত থাকলেও সেগুলো উত্তোলন ও বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এসব সম্পদের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিরল খনিজ সরবরাহের ওপর চীনের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে মধ্য এশিয়ার সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক হিসাবের অংশ হতে পারে।

তবে রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাবন্দি করা, স্বাধীন সাংবাদিকদের আটক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কমে যাওয়ার সমালোচনা করেছেন পর্যবেক্ষকেরা।

ইলখামভ বলেন, ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার থেকে মানবাধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলো কার্যত হারিয়ে গেছে। এ কারণে মার্কো রুবিওর মধ্য এশিয়া সফরের আলোচ্যসূচিতে এসব সমস্যা গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।

নরওয়েজিয়ান হেলসিঙ্কি কমিটির জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ইভার ডালে বলেন, ট্রাম্পের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার কিছু অস্বস্তিকর মিল রয়েছে। তবে তাঁর মতে, মধ্য এশিয়া ও অঞ্চলটির চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে রুবিওর ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের তুলনায় বেশি স্পষ্ট হতে পারে।

ডালের মতে, ‘সি৫+১’ কাঠামোকে ভবিষ্যতে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে মানবাধিকার ইস্যুতে আবারও গুরুত্ব দিতে হবে।

সমরকন্দের সম্মেলনে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে কী অগ্রগতি হয়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নগুলো আলোচনার বাইরে থেকে গেলে মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ পূরণ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন