- ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের মসজিদগুলোতে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর উদ্যোগ নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন অঞ্চলটির রাজনৈতিক নেতা ও মুসলিম ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের অভিযোগ, এ উদ্যোগের মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিসরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ড সম্প্রতি অঞ্চলটির মসজিদগুলোতে একই ধরনের খুতবা প্রচলনের প্রস্তাব দেয়। বোর্ডটির প্রধান দারাখশান আন্দ্রাবি ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত একজন স্থানীয় নেতা। গত সপ্তাহের শেষ দিকে বোর্ডের এ উদ্যোগ সামনে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে সমালোচনা শুরু হয়। মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতদের শীর্ষস্থানীয় একটি অংশ এ প্রস্তাবকে কাশ্মীরের মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছে।
ওয়াক্ফ বোর্ডের দাবি, সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে দারাখশান আন্দ্রাবি বলেন, বোর্ডের অধীনে প্রস্তাবিত একটি কমিটি অভিন্ন খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে। মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় এমন পদক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জুমার খুতবা অনুমোদনের দায়িত্বে থাকবেন ধর্মীয় পণ্ডিতেরা; এ প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা থাকবে না।
তবে বোর্ডের এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অনেক ধর্মীয় নেতা। গত রোববার কাশ্মীরের প্রায় দেড় হাজার বিশিষ্ট ধর্মীয় পণ্ডিত ও খতিবকে নিয়ে বৈঠক ডাকে ওয়াক্ফ বোর্ড। তাঁদের কেউ সরাসরি উপস্থিত হন, আবার দুর্গম এলাকার কয়েকজন অনলাইনে বৈঠকে যুক্ত হন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া রাজৌরি জেলার এক ধর্মীয় পণ্ডিত আল জাজিরাকে জানান, বোর্ডপ্রধান নির্দেশ দিয়েছেন, জ্যেষ্ঠ পণ্ডিতদের একটি কমিটির তৈরি ও পূর্বানুমোদিত খুতবাই শুক্রবার মসজিদগুলোতে পাঠ করতে হবে। তবে ওই কমিটিতে কারা থাকবেন, তা স্পষ্ট করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই পণ্ডিত বলেন, খুতবার বিষয়বস্তু ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তাঁরা নির্দেশনা মানবেন না এমন আপত্তি জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের উদ্বেগ গুরুত্ব পায়নি এবং কথা বলার সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বোর্ডপ্রধান সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত বলে জানান এবং বলেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চার বছর ধরে চলছে।
কাশ্মীরের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নাঈম আখতার মনে করেন, ওয়াক্ফ বোর্ড তার প্রশাসনিক দায়িত্বের সীমা ছাড়িয়ে ধর্মীয় কার্যক্রমে নির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, অতীতে সুলতান বা খলিফাদের নামে অভিন্ন খুতবা প্রচলনের নজির থাকলেও বর্তমান সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মীয় বক্তৃতার বিষয়বস্তু নির্ধারণের অধিকার কোনো প্রশাসনিক সংস্থার থাকা উচিত নয়।
নাঈম আখতারের মতে, একজন ধর্মীয় বক্তার শ্রোতা থাকলে তিনি নিজের পছন্দের বিষয়ে কথা বলার স্বাধীনতা ভোগ করবেন। ওয়াক্ফ বোর্ডের কাজ মূলত ধর্মীয় সম্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা; ধর্মীয় নেতারা কীভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণ করা নয়। বোর্ডপ্রধানের সঙ্গে বিজেপির সংশ্লিষ্টতা থাকায় এ উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ আরও বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কাশ্মীরের প্রধান মুসলিম ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুকও এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। মঙ্গলবার তিনি সতর্ক করে বলেন, অভিন্ন খুতবা চালুর উদ্যোগ ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল হতে পারে।
মিরওয়াইজের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের যৌথ প্ল্যাটফর্ম মুতাহিদা মাজলিস-ই-উলামাও জানিয়েছে, খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব ইসলামি পণ্ডিতদের, কোনো প্রশাসনিক সংস্থার নয়।
এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত সরকারের প্রধান ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লাহও। তাঁর দল অঞ্চলটির আগের স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
সমালোচনার মুখে পরে নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেন দারাখশান আন্দ্রাবি। তিনি জানান, আত্মহত্যা বৃদ্ধি, মানসিক চাপ, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে কীভাবে বক্তব্য দেওয়া হবে, তা স্বাধীন ধর্মীয় পণ্ডিত, প্রচারক ও খতিবদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
জম্মু ও কাশ্মীর দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অঞ্চলটির বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে। একই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এর আগে অঞ্চলটি বিশেষ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত এবং নিজস্ব আইন প্রণয়নের সুযোগ ছিল।
বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর ওয়াক্ফ সম্পত্তি পরিচালনার স্থানীয় আইন ও ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসে। মুসলমানদের দাতব্য ও জনকল্যাণমূলক ধর্মীয় সম্পত্তি পরিচালনাকারী ওয়াক্ফ ব্যবস্থায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত আইন প্রয়োগ শুরু হয়। এর ফলে ধর্মীয় বোর্ডগুলোর ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রভাব বেড়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় নেতারা।
এর আগে একাধিকবার ওয়াক্ফ বোর্ডের বিরুদ্ধে কাশ্মীরের প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মসজিদগুলোর ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে ‘মসজিদের প্রোফাইলিং’ শিরোনামে চার পৃষ্ঠার একটি ফরম বিতরণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন মুসলিম পণ্ডিতেরা। ওই ফরমে তাঁদের জীববৈজ্ঞানিক পরিচিতিসংক্রান্ত তথ্যও চাওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
শ্রীনগরের প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো জামিয়া মসজিদেও ঈদের নামাজ ও রমজানের পবিত্র লাইলাতুল কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপলক্ষে বিভিন্ন সময় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রশাসনের যুক্তি, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে ধর্মীয় নেতাদের অভিযোগ, এ ধরনের বিধিনিষেধ কাশ্মীরের মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করছে।
ওয়াক্ফ বোর্ডের বিরুদ্ধে এর আগেও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় রীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে বোর্ডটি বিভিন্ন দরগায় ভক্তদের দেওয়া স্বেচ্ছা নজর-নিয়াজের অর্থ সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি বন্ধ করে দেয়। বোর্ডের যুক্তি ছিল, নতুনভাবে প্রযোজ্য কেন্দ্রীয় আইন অনুসারে এসব অর্থের ব্যবস্থাপনা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন। পরে বিভিন্ন স্থানে বোর্ডের নিজস্ব দানবাক্স স্থাপন করা হয়।
কাশ্মীরের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ নূর আহমদ বাবা মনে করেন, অঞ্চলটিতে ধর্ম দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ সহজেই রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। তাঁর মতে, মাদকাসক্তি, দেরিতে বিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক সম্প্রীতির মতো বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। তবে উদ্যোগটি গ্রহণযোগ্য ধর্মীয় নেতাদের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসায় মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
কাশ্মীরবিষয়ক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকও মনে করেন, অঞ্চলটির মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যেকোনো উদ্যোগকে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের মধ্যে কাশ্মীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া বাড়াচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মসজিদে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব কেবল ধর্মীয় আলোচনার বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং কাশ্মীরে ধর্মীয় স্বাধীনতা, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।