- ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। নেত্রকোনা
নেত্রকোনার সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যাকাণ্ডের পর সামনে এসেছে তাঁর পুরোনো একটি বক্তব্য। গত বছরের নভেম্বরে জেলা পুলিশের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রকাশ্যেই নিজের প্রাণনাশের আশঙ্কা জানিয়েছিলেন তিনি। এমনকি সভা চলাকালে বাইরে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা অবস্থান করছে বলেও দাবি করেছিলেন। সম্প্রতি হত্যাকাণ্ডের পর সেই সভার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামের যোগদান উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে ওই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত পুলিশ সুপারের সামনে আলিফ নিজের নিরাপত্তাঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে জেলার সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, মাদক কারবার ও অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের কারণে হুমকির বিষয়টিও উঠে আসে।
সভায় আলিফ বলেছিলেন, তিনি সেখানে বসে থাকা অবস্থাতেই খবর পেয়েছেন, কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি রাস্তার পাশে অপেক্ষা করছে। তাঁদের কাছে নাইন এমএম পিস্তল ও গুলি রয়েছে এবং তিনি বের হলে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
নিজের সাংবাদিকতার কাজের প্রসঙ্গ টেনে আলিফ জানান, তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন করেন। দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এলাকায় চোরাচালান, মাদক কারবার এবং অস্ত্রধারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি সংবাদ প্রকাশ করতেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় সংঘবদ্ধ আটটি চক্র সক্রিয় ছিল, যাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র বহন, বিস্ফোরক ও মাদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল।
পুলিশের উদ্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা না হলে তাঁকে হয় দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, নয়তো পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অন্য পথে যেতে হবে। একই সঙ্গে নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, শ্বশুরবাড়িতে হামলা বা অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা হতে পারে।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানানোর কয়েক মাস পরই হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন আলিফ। বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্তরাইল এলাকার তেলনজিয়া গ্রামে একটি চায়ের দোকানের সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
আলিফ আইপিটিভি চ্যানেল ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। ওই পেজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত তথ্যভিত্তিক পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশ করতেন।
তাঁর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার করা আলামত এবং আলিফের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্টসহ বিভিন্ন বিষয় তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। তাঁকে নাইন এমএম পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডের ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, তাঁর যোগদানের সময় আয়োজিত সভায় আলিফ এসব আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। সে সময় গত নভেম্বরে তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।
পুলিশ সুপার জানান, আগের ঘটনার পাশাপাশি বর্তমান হত্যাকাণ্ডের সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আলিফের আগের বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে আগের হামলার ঘটনা ও বর্তমান হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। হত্যার কারণ এবং কারা এ ঘটনায় জড়িত, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।