Saturday, October 10, 2026

গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছরেও থামেনি প্রাণহানি, নিহত ১,৪৭১ ফিলিস্তিনি


ছবিঃ ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গাজা সিটিতে রাতের বেলা ইসরায়েলি বিমান হামলার পর মানুষ একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা /ওমর আল-কাত্তা/এএফপি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতির এক বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ইসরায়েলি হামলায় এখনো প্রাণ হারাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা, আর ত্রাণ ও পুনর্গঠনসামগ্রী প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ। আন্তর্জাতিক শতাধিক মানবিক সহায়তা সংস্থা, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এক যৌথ বিবৃতিতে এ পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন।

শুক্রবার প্রকাশিত বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, সেভ দ্য চিলড্রেন, অক্সফাম ও গ্রিনপিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জানায়, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অন্তত ১ হাজার ৪৭১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৫ হাজার ১৮৯ জন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩২৭ শিশু রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্থাগুলোর অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় প্রতিদিন ফিলিস্তিনিরা নিহত ও আহত হচ্ছেন। একই সঙ্গে ত্রাণ, চিকিৎসাসামগ্রী, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের উপকরণ প্রবেশে বাধা থাকায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের মহাসচিব ইয়ান এগেলান্ড বলেন, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক বছর পরও গাজার ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রায় সামান্যই পরিবর্তন এসেছে। তাঁর মতে, পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে ইসরায়েলের বিধিনিষেধ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত করছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রধান নির্বাহী ইঙ্গার অ্যাশিং বলেন, শিশুরা যখন নিহত হচ্ছে এবং পরিবারগুলো যখন নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে পারছে না, তখন যুদ্ধবিরতির প্রকৃত অর্থ থাকে না। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গড়ে প্রায় প্রতিদিনই একজন শিশু নিহত হয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থাও চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শুক্রবারের বিবৃতি অনুযায়ী, উপত্যকার ৩৬টি হাসপাতালের কোনোটিই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির ঘাটতির কারণে অবশিষ্ট স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্তত ১৮ হাজার ৫০০ রোগীর জরুরি ভিত্তিতে গাজার বাইরে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার শিশু রয়েছে। চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা এক হাজারের বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবাসন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয় প্রয়োজন। উপত্যকার প্রায় ৮০ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত নির্মাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় বহু পরিবার এখনো নিরাপদ বাসস্থানে ফিরতে পারছে না।

এর পাশাপাশি খাদ্যসংকটও প্রকট। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ সংকটজনক মাত্রার খাদ্যসংকট বা তার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে থাকতে পারেন।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও শুক্রবার গাজার মধ্যাঞ্চলের আল-মুসাদ্দার, মাগাজি ও বুরেইজ শরণার্থীশিবির এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত একজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এসব এলাকায় কামানের গোলাবর্ষণেরও খবর পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে বানি সুহেইলা গোলচত্বরের দিকে ইসরায়েলি ট্যাংক থেকে ভারী গোলাবর্ষণ করা হয়। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণে অন্তত আটজন নিহত এবং আরও কয়েক ডজন মানুষ আহত হন।

যৌথ বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কাঠামোর আওতায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও ফিলিস্তিনিদের বসবাসের এলাকার মধ্যে বিভাজন তৈরির জন্য নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ সীমারেখা একতরফাভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে গাজায় প্রাণহানির সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে অন্তত ৭৪ হাজার ২৫৪ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ২১ হাজার শিশু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সতর্ক হিসাব অনুযায়ী, আহতদের প্রায় ২৪ শতাংশের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের গুরুতর আঘাতে আক্রান্তদের এক-চতুর্থাংশই শিশু।

তবে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে মূলত হাসপাতালে নথিভুক্ত বা আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত মৃত্যুর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা বা এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকে এই হিসাবে নেই।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে জবাবদিহির দাবি চাপা পড়ে থাকতে পারে না। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েলকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা মানতে চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ব্যর্থতা ফিলিস্তিনিদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় নৃশংসতা অব্যাহত থাকার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দাবি, গাজায় প্রকৃত অর্থে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বন্ধ, অবাধ মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন