Sunday, October 18, 2026

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ, প্যারিসে সংঘর্ষ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ


ছবিঃ জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে, বিক্ষোভকারীরা ‘প্লেস দে লা রিপাবলিক’-এ অবস্থিত ভাস্কর্যটিকে একটি হলুদ ভেস্ট পরিয়ে দেন। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /এএফপি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেন। কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে প্যারিসেই সমবেত হন প্রায় এক লাখ ১০ হাজার মানুষ।

প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক ম্যারিয়ানের ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হওয়া অধিকাংশ বিক্ষোভকারী ছিলেন তরুণ। তাঁদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদী বার্তা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষও হয়।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই বিস্তৃত সামাজিক অসন্তোষের রূপ নিয়েছে। সরকারি সেবার মান কমে যাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকদের একাংশও।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক স্কুলশিক্ষার্থী বলেন, সরকারকে নিজেদের দাবিগুলো স্পষ্টভাবে জানাতেই তাঁরা আবার রাস্তায় নেমেছেন। তাঁর ভাষ্য, নিজেদের অধিকার ফিরিয়ে পেতে চান তাঁরা।

ফ্রান্সের অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (CGT) এই বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটি মজুরি ও পেনশন বাড়ানো, দ্রব্যমূল্য কমানো এবং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সেবা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।

শনিবার দুপুরের পর প্যারিসের পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজির মতো বিস্ফোরক নিক্ষেপ করেন। এ সময় একটি গাড়ি ও সংবাদপত্র বিক্রির একটি স্টলে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

পরিস্থিতির কারণে প্যারিসের বেশ কয়েকটি ক্যাফে ও দোকান বন্ধ রাখা হয়। দমকলের গাড়ির সাইরেন শোনা যায় শহরের বিভিন্ন এলাকায়। তবে সহিংসতার মধ্যেও অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে অংশ নেন। পরে মিছিলটি প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে এগিয়ে যায়।

রাজধানীর বাইরেও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্সেই শহরে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ নগর ভবনে প্রবেশ করে এবং কয়েকটি দোকানে লুটপাট চালায়। লিওঁ শহরে একটি পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার খবর প্রকাশ করেছে স্থানীয় গণমাধ্যম।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্যারিস, মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জেসসহ বিভিন্ন শহরে সহিংস ঘটনার পর অন্তত ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, মুখোশধারী কিছু ব্যক্তি লুটপাটের চেষ্টা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, রাস্তায় থাকা বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়া এবং গণমাধ্যম ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলার মতো ঘটনায় জড়িত ছিলেন। এসব ঘটনার জন্য কর্তৃপক্ষ ‘চরম বামপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বক্তব্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষায় বৈষম্যের কারণে তাঁদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ফ্রান্সের মানবাধিকার সংগঠন লিগ দে দ্রোয়া দ্য লোমের সদস্য জ্যঁ পিয়েরের মতে, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ জমেছে। তাঁর ভাষ্য, এই নানা ধরনের উদ্বেগই বিপুলসংখ্যক মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে।

বিক্ষোভে সন্তানদের পাশে দাঁড়াতে এসেছিলেন অভিভাবকেরাও। তিন সন্তানের মা আমেলি বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই তিনি আন্দোলনে সমর্থন জানাতে এসেছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।

প্যারিসভিত্তিক সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চের গবেষক ব্রুনো কাত্রেসের মতে, শনিবারের বিক্ষোভ একাধিক আন্দোলন ও অসন্তোষের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। উচ্চ কর, বিপুল সরকারি ঋণ এবং বাজেট ঘাটতির কারণে জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশটি কোন পথে এগোচ্ছে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন বাড়ছে।

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের উপশহর ক্রেতেইয়ের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বর্তমান আন্দোলনের সূচনা হয়। জরাজীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ থেকে তারা রাস্তায় নামে।

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বানের মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা শুরু হয়। সে সময় ডিজেল ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও ধনীদের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে নতুন এই আন্দোলন ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগামী বছরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির রাজনীতিতে মেরুকরণ বাড়ছে। ওই নির্বাচনের পর ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে অতি ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি ক্ষমতায় আসতে পারে এমন সম্ভাবনা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।

বিক্ষোভের আগের দিন শুক্রবার ব্রাসেলসে মাখোঁ শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। তবে এ অধিকারের সঙ্গে মানুষ ও সম্পদের প্রতি সম্মান দেখানোর দায়িত্বও রয়েছে; ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ গ্রহণযোগ্য নয়।

এদিকে সরকারি ঋণ কমানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও ফ্রান্সের সরকার এখনো বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। দেশটির সরকারি ঋণ গ্রহণের ব্যয় দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপ, জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ-উদ্বেগ এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে বিক্ষোভের বিস্তার মাখোঁ সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন