Monday, October 19, 2026

ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতার জের: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন ম্যাক্রোঁ


ছবিঃ ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে লিওঁতে পুড়ে যাওয়া পর্যটন কার্যালয়টি পরীক্ষা করছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ কর্মকর্তারা। শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আয়োজিত বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার একদিন পর এই ঘটনা ঘটে। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /জেফ পাচুদ/এএফপি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বরং পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তাঁকে দায়িত্বে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে লুটপাটকারীদের মোকাবিলায় নতুন কৌশল গ্রহণ এবং সহিংসতা ঠেকাতে নিরাপত্তা পরিকল্পনার ব্যর্থতা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের দপ্তর এলিসি প্রাসাদের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে নেতৃত্ব ও সমন্বয় বজায় রাখার স্বার্থে নুনেজকে দায়িত্বে থাকতে বলেছেন ম্যাক্রোঁ। পাশাপাশি বিক্ষোভের সময় লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নতুন পদ্ধতি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সহিংসতার আগে নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে যেসব ঘাটতি ছিল, সেগুলো চিহ্নিত করে স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছেন প্রেসিডেন্ট।

গত শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিনের ঘটনায় দুই হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। আহত হন প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য। বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও হতাহতের ঘটনা ঘটে। জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত পুলিশের একটি গ্রেনেডে এক বিক্ষোভকারীর হাত উড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষও যুক্ত হয়। এতে শনিবারের কর্মসূচি ব্যাপক জনসমাগমে রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি দল পৌরসভা ভবন, পুলিশ স্টেশনসহ সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়।

সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ স্বীকার করেন, বিক্ষোভের সময় কয়েকটি বড় শহরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, শত শত দোকান লুট হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের সামনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে দাবি করা কঠিন।

নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রেও আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। নুনেজ জানান, বিক্ষোভের আশপাশে জড়ো হওয়া বিপুলসংখ্যক দাঙ্গাকারী ও লুটপাটকারীদের সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করা সম্ভব হয়নি। শনিবার সারা দেশে প্রায় ৬০ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে জানান তিনি।

সহিংসতায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করে নুনেজ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে তাঁর পদত্যাগের প্রস্তাব দেওয়া যথার্থ ছিল। তবে ম্যাক্রোঁ তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ না করে তাঁকে দায়িত্বে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

শনিবারের সহিংসতার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। রোববার প্যারিসে আরও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। রাজধানীর মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার সোমবার জানান, আগের দিন শহরটির প্রায় ৩০টি দোকান হামলা ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। ঘটনাগুলোকে তিনি অসহনীয় বলে বর্ণনা করেন।

নুনেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার ও রাতভর প্যারিসে প্রায় ৩৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে, বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানান, পুরো সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে দুই হাজার ৩৩০ জনের বেশি মানুষকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।

সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে রয়েছে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ফ্রান্সের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যার কারণে শ্রেণিকক্ষে চাপ, শিক্ষকস্বল্পতা এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে আসছিলেন।

পরে সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। ফলে শিক্ষার্থীদের দাবিতে শুরু হওয়া কর্মসূচি দেশজুড়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটিকে ফ্রান্সের অন্যতম বড় তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিক্ষোভকারীদের একাংশের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধার অভাব দূর করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া মানুষও তাঁদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

আন্দোলনের সঙ্গে সহিংসতা ও লুটপাট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সমাধান, অন্যদিকে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা দুই দিক সামলাতে হচ্ছে ফরাসি সরকারকে।

ম্যাক্রোঁর সিদ্ধান্তে আপাতত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ দায়িত্বে থাকছেন। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতিতে ঘাটতি, সহিংসতা মোকাবিলার কৌশল এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা নিয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।


Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন