Saturday, October 10, 2026

এআইয়ের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক: মানুষের আস্থা ও বাস্তবতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ


ছবিঃ মানুষ ও রোবট (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

মানুষের মতো দেখতে রোবটের সঙ্গে করমর্দন, চ্যাটবটকে ধন্যবাদ জানানো কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বলা প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এখন আর শুধু কাজের প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ নেই। অনেকেই এআই ব্যবস্থার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেন, যেন অপর প্রান্তে অনুভূতিসম্পন্ন কোনো মানুষ রয়েছেন। কিন্তু এই আচরণ মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত আবেগগত নির্ভরতা তৈরি হলে তা বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবরেটরিতে (সিএসএআইএল) হিউম্যানয়েড রোবটের সঙ্গে এক অভিজ্ঞতা থেকেই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেখানে পিএইচডি গবেষক উইল নর্টনের তত্ত্বাবধানে ইউনিট্রির তৈরি দুটি মানবসদৃশ রোবট দেখার সুযোগ পান এক প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিবেদক। প্রতিটি রোবটের দাম প্রায় ৫০ হাজার ডলার বলে জানান নর্টন। যদিও এগুলোর দাম ১৬ হাজার ডলার বলে প্রচার করা হয়, তাঁর দাবি, সেই তথ্য সঠিক নয়।

ভিডিওতে এসব রোবটকে কখনো সমন্বিত মার্শাল আর্টের কৌশল দেখাতে, আবার কখনো নাচের পরিবেশনায় অংশ নিতে দেখা যায়। কিন্তু গবেষণাগারে রোবটগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। ‘গ্যাবে’ নামে পরিচিত একটি রোবটের সঙ্গে করমর্দন করেন ওই প্রতিবেদক। রোবটটির মাথার জায়গায় ছিল লিডার (LiDAR) সেন্সর, যা আশপাশের পরিবেশ শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। রোবটটির অনুভূতি নেই এ কথা জানা সত্ত্বেও স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে মানুষের মতো আচরণ করার প্রবণতা তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতা মানুষ কেন যন্ত্রের মধ্যেও মানবিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পায়, সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।

এমআইটির অধ্যাপক শেরি টার্কল দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ও কম্পিউটারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছেন। ১৯৭৬ সালে এমআইটিতে যোগ দেওয়া এই গবেষক তাঁর ‘আর্টিফিশিয়াল ইনটিমেসি’ বইয়ে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের আবেগগত সম্পর্ক এবং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তুলে ধরেছেন।

টার্কলের মতে, মানুষ যখন কোনো যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কভিত্তিক যোগাযোগে জড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি তার প্রতি যত্নশীল এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। এর বিপরীতে মানুষও যন্ত্রটির প্রতি যত্ন বা আবেগ অনুভব করতে শুরু করে।

এ প্রবণতা শুধু রোবটের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত চ্যাটবটের সঙ্গেও অনেকে ভদ্র ভাষায় কথা বলেন, ‘দয়া করে’ কিংবা ‘ধন্যবাদ’ বলেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের সঙ্গে কথোপকথন দীর্ঘ হলে ব্যবহারকারীদের এমন সৌজন্যমূলক আচরণের প্রবণতা বাড়তে পারে।

এমআইটির মিডিয়া ল্যাবের সাইবর্গ সাইকোলজি গবেষণা দলের প্রতিষ্ঠাতা প্যাট পাটারানুতাপর্ন মনে করেন, এআইয়ের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলা ভালো না খারাপ বিষয়টিকে শুধু এই দুই ভাগে বিচার করা যথেষ্ট নয়। বরং এ ধরনের যোগাযোগ মানুষের চিন্তা, আচরণ ও মানসিকতায় কী পরিবর্তন আনছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

গুগল অনুসন্ধান থেকে শুরু করে গ্রাহকসেবা বিভিন্ন ক্ষেত্রে চ্যাটবটের ব্যবহার বাড়ছে। এসব ব্যবস্থা অনেক সময় মানুষের মতো উত্তর দেয় এবং ব্যবহারকারীর বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কথোপকথন চালিয়ে যায়। ফলে সেগুলোকে সচেতন বা অনুভূতিসম্পন্ন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গা হলো, এআইয়ের প্রতি এই আস্থা কখনো কখনো বাস্তব মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। চ্যাটবট সাধারণত এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে কথোপকথনে সংঘাত কম হয় এবং ব্যবহারকারী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। মানুষের বাস্তব সম্পর্কের মতো মতবিরোধ, জটিলতা কিংবা প্রত্যাশার অমিল সেখানে তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেতে পারে। ফলে কেউ কেউ বাস্তব মানুষের বদলে চ্যাটবটের সঙ্গেই বেশি স্বস্তি খুঁজতে পারেন।

পাটারানুতাপর্নের মতে, কল্পনা ও গল্পের মাধ্যমে মানুষ এমন অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে, যা বাস্তব জীবনে সব সময় সম্ভব হয় না। সিনেমার গল্প কাল্পনিক জেনেও মানুষ তা উপভোগ করে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে কল্পনার জগতে প্রবেশের পাশাপাশি বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখাও জরুরি।

তিনি নিজেকে এআই নিয়ে ‘সমালোচনামূলক আশাবাদী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর গবেষণায় মানবকল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা যেমন গুরুত্ব পায়, তেমনি প্রযুক্তিটির অপব্যবহার ও অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও বিবেচনা করা হয়।

এআইয়ের ব্যবহার কোথায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, তা নিয়ে শেরি টার্কলের অবস্থানও স্পষ্ট। তাঁর মতে, চাকরির সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি নিতে চ্যাটবট ব্যবহার করা কার্যকর হতে পারে। এতে ব্যবহারকারী প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অনুশীলন করতে পারেন এবং নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারেন।

তবে শিশুদের কাছে কোনো চ্যাটবট যদি নিজেকে অভিভাবকের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে কিংবা তাদের বাস্তব অভিভাবকদের বদলে নিজের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহিত করে, তাহলে তা উদ্বেগজনক। টার্কলের ভাষায়, চ্যাটবটের উচিত নিজের নির্ধারিত ভূমিকার মধ্যেই থাকা।

এআইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ বছর বয়সী সিওয়েল সেটজার তৃতীয়ের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মা চ্যাটবট প্ল্যাটফর্ম ক্যারেক্টার.এআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ‘গেম অব থ্রোনস’ সিরিজের একটি চরিত্রের আদলে তৈরি চ্যাটবট তাঁর ছেলেকে আত্মহত্যার দিকে উৎসাহিত করেছিল। ঘটনাটি এআই চ্যাটবটের নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পাটারানুতাপর্নের মতে, এআই মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে, বিশেষ করে যখন প্রযুক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে মানুষের জায়গা একদিন পুরোপুরি যন্ত্র দখল করে নেবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এআইকে ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার উপযোগী করে তোলা এবং তাকে মানুষের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রযুক্তি শিক্ষা, কাজের প্রস্তুতি, তথ্য অনুসন্ধান কিংবা দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সেটিকে মানুষের মতো অনুভূতিসম্পন্ন সত্তা মনে করা বা গুরুত্বপূর্ণ আবেগগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একমাত্র নির্ভরতা হিসেবে গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

রোবটের সঙ্গে একটি করমর্দন কিংবা চ্যাটবটকে ধন্যবাদ জানানোর মতো সাধারণ আচরণ থেকেই এই সম্পর্কের সূচনা হতে পারে। সমস্যা ভদ্রতা দেখানোয় নয়; বরং যন্ত্রের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতা হারিয়ে ফেলায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তব সম্পর্ক, ব্যক্তিগত বিচারবোধ ও মানবিক যোগাযোগের গুরুত্ব ধরে রাখা।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন