- ১০ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
ভারতে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু করতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে ইলন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। তবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় দেশটিতে এখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি সেবাটি। এর মধ্যেই ভারতের শীর্ষ ধনকুবের ও রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানিকে লক্ষ্য করে নতুন করে সমালোচনা করেছেন মাস্ক। ব্যঙ্গ করে তাঁকে ভারতের ‘প্রধানমন্ত্রী’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেছেন, আম্বানি নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় স্টারলিংকের প্রতিযোগিতার পথে বাধা সৃষ্টি করছেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মাস্ক বলেন, স্টারলিংক এমন সব এলাকায় ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে পারে, যেখানে এখনো সংযোগ নেই। এতে শিশুরা শিক্ষার আরও সুযোগ পাবে এবং ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রাহকের কাছে নিজেদের পণ্য ও সেবা পৌঁছাতে পারবে।
একই পোস্টে আম্বানিকে উদ্দেশ করে মাস্ক লেখেন, ভারতের মানুষের কাছ থেকে একচেটিয়া ব্যবসার সুবিধা ধরে রাখাই হয়তো তাঁর পছন্দ। তারপরও স্টারলিংককে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স জিও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ভারতে স্টারলিংকের কার্যক্রম শুরু করতে বিলম্বের বিষয়টি নিয়ে চলতি সপ্তাহেই একাধিকবার মুখ খুলেছেন মাস্ক। এর আগে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় স্টারলিংকের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করছেন। যদিও তিনি তখন নির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ করেননি।
ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, দেশটির স্যাটেলাইট যোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামো ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন। পরে বৃহস্পতিবার আম্বানির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে চান, আম্বানিই কি ভারতের প্রকৃত ক্ষমতাধর ব্যক্তি?
তবে ভারতের কেন্দ্রীয় টেলিযোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া শুক্রবার মাস্কের একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগের জবাবে বলেছেন, দেশটির কোনো খাতেই একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হয় না।
ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টারলিংকসহ লাইসেন্স পাওয়া তিনটি স্যাটেলাইট অপারেটর বর্তমানে নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্যাটেলাইট স্পেকট্রাম বরাদ্দ পাওয়ার আগে এই প্রক্রিয়া শেষ করা বাধ্যতামূলক। প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। ফলে স্টারলিংককে আলাদাভাবে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তারা নাকচ করেছে।
ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও দেশটির বাজারে সেবা চালুর প্রস্তুতি নিয়েছিল রিলায়েন্স জিও ও ভারতী এয়ারটেল। গত বছর প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর স্টারলিংকের সেবা বিতরণের জন্য প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে চুক্তিও করে স্পেসএক্স। তবে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর চূড়ান্ত অনুমতি পায়নি মাস্কের প্রতিষ্ঠান।
জিও লুক্সেমবার্গভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসইএসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, এয়ারটেল স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েবের অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার। প্রতিষ্ঠানটিও ভারতে স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগসেবা চালুর চেষ্টা করছে।
স্যাটেলাইট স্পেকট্রাম কীভাবে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা নিয়েও আগে জিও ও স্টারলিংকের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। স্টারলিংক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্পেকট্রাম বরাদ্দের পক্ষে ছিল। অন্যদিকে, জিও চেয়েছিল নিলামের মাধ্যমে তা বরাদ্দ দেওয়া হোক। শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্পেকট্রাম বরাদ্দের পথেই এগিয়েছে।
বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ ভারতে একশ কোটিরও বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন। ফলে দেশটি মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবসার জন্য বড় সম্ভাবনাময় বাজার। তবে সেখানে ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আম্বানির মতো প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং সরকারের নিয়ন্ত্রক নীতির সঙ্গে সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণে মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলাকেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত বছর দেশটিতে গাড়ি বিক্রি শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। তবে ইলেকট্রেকের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ১২ মাসে সেখানে মাত্র ৬৯৯টি গাড়ি সরবরাহ করেছে টেসলা।
উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে ভারতে টেসলার মডেল ওয়াইয়ের দাম যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকে দাম কমালেও দেশটিতে গাড়িটির মূল্য এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সব মিলিয়ে, স্টারলিংকের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন, স্যাটেলাইট স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারে বিদ্যমান প্রতিযোগিতা—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই এখন বিরোধের কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। মাস্কের অভিযোগের বিপরীতে ভারত সরকার নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের কথা অস্বীকার করায় স্টারলিংকের ভারতে যাত্রা শুরুর সময়সীমা এখনো অনিশ্চিত।