- ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের কর্মপরিবেশ, কর্মীদের দায়িত্ব এবং নিয়োগের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি বিভাগে নবীন কর্মীর অনুপাত কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে কর্মীদের বৈঠকের সময় এবং এআইয়ের তৈরি করা কাজ পর্যালোচনা ও পরিচালনার চাপ।
শুক্রবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। অ্যানথ্রপিকের মতে, তাদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে দেখা দেওয়া এই পরিবর্তনগুলো বৃহত্তর অর্থনীতিতে এআইয়ের প্রভাব, নিয়োগের ধারা এবং কাজের সংগঠন কীভাবে বদলাতে পারে, তারও ইঙ্গিত দিতে পারে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের দৈনন্দিন কাজের বড় অংশেই এআইকে যুক্ত করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি বিভাগে নবীন পর্যায়ের কর্মীদের অংশ ছিল ২১ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ শতাংশে। নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। প্রযুক্তি বিভাগে নবীন কর্মী নিয়োগের হার ২৭ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৯ শতাংশে।
একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর মধ্যে প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীদের অনুপাতও কমেছে। আগে মোট কর্মীর ৬১ শতাংশ প্রযুক্তি বিভাগে কাজ করতেন, বর্তমানে সেই হার ৫৬ শতাংশ। অ্যানথ্রপিকের ব্যাখ্যা, প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রয়, ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পরিসর স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে। পাশাপাশি এআইভিত্তিক কোড তৈরির সরঞ্জাম ব্যবহার করে অপ্রযুক্তিগত বিভাগের কর্মীরাও এখন নিজেরা সফটওয়্যার তৈরি করতে পারছেন।
তবে এআইয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে কাজের গতি নিয়ে কর্মীদের ওপর চাপও বাড়ছে। প্রতিবেদনে একজন কর্মীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিকে যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করা এবং প্রায় সব কাজে ক্লদ (Claude) ব্যবহারের একটি অবিরাম চাপ রয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে পরিচালিত এক কর্মী জরিপে ২৭ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, ক্লদ ব্যবহারের কারণে তাঁদের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। অন্যদিকে, ২০ শতাংশ কর্মীর অভিজ্ঞতা হলো, তাঁদের কাজের ধরন এমনভাবে বদলেছে যে নিজেরা সরাসরি কাজ করার চেয়ে এআইয়ের মাধ্যমে করানো কাজ পরিচালনা করতেই বেশি সময় দিতে হচ্ছে।
একজন প্রকৌশলী এই অভিজ্ঞতার তুলনা করেছেন শিশুর দেখভালের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যেমন প্রতিটি শিশুই আলাদা মনোযোগ দাবি করে, তেমনি একাধিক এআই ব্যবস্থাও একই সময়ে নানা সমস্যা ও কাজ নিয়ে মানুষের মনোযোগ চায়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এআই দ্রুত বিপুল পরিমাণ লেখা ও অন্যান্য কাজ তৈরি করতে পারলেও সেগুলো পড়া, যাচাই করা, সাজানো এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মানুষের ওপরই থাকছে। ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে মানুষের মনোযোগ ও বিচার-বিবেচনাই এখন বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে উঠতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের দাবি, এআই ব্যবহারের ফলে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কাজে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। কর্মীপ্রতি কোড তৈরির পরিমাণ বৃদ্ধি, প্রতি বিক্রয়কর্মীর মাধ্যমে বেশি বিক্রয় সম্পন্ন করা এবং অধিকসংখ্যক চুক্তি প্রক্রিয়াকরণের মতো বিষয়কে এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, বেশি কোড তৈরি হলেই তা যে উন্নত মানের হবে বা ব্যবসায়িক সাফল্য বাড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একই সঙ্গে তাদের পর্যবেক্ষণে এখন পর্যন্ত কোডের মান কমে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন কমেনি; বরং বৈঠকের সময় বেড়েছে। কর্মীদের ক্যালেন্ডারের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছর আগের তুলনায় অ্যানথ্রপিকে কর্মীপ্রতি বৈঠকের সময় ২০ শতাংশ বেড়েছে। প্রযুক্তি বিভাগের সরাসরি কারিগরি কাজে যুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ১৬ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যাখ্যা, কাজের গতি বাড়াতে এআই সহায়তা দিলেও পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্বশীলতা এবং সমন্বয়ের জন্য মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীরাও জানিয়েছেন, সামনাসামনি আলোচনা ও সমন্বয় তাঁদের কাজের অপরিহার্য অংশ।
অ্যানথ্রপিকের এই অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব শুধু কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে বদলে যাচ্ছে কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন, নিয়োগের চাহিদা এবং কাজের ধরনও। তবে এআই যত বেশি কাজ করতে পারবে, ততই মানুষের ভূমিকা শেষ হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়। বরং এআইয়ের তৈরি ফলাফল যাচাই, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব মানুষের ওপর আরও বেশি করে পড়তে পারে।