Wednesday, October 14, 2026

দিল্লিতে বিক্ষোভের জেরে কারাগারে সিজেপির দুই নেতা আশুতোষ ও সৌরভ


ছবিঃ মঙ্গলবার সকালে যন্তর মন্তরে সিজেপি-র আশুতোষ রাঙ্কা (বাঁয়ে) ও সৌরভ দাসকে আটক করা হয় (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দুই শীর্ষ নেতাকে পাঁচ দিনের বিচারিক হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আদালতে হাজির করার পর এ আদেশ দেওয়া হয়। এর আগে মঙ্গলবার দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রবেশের ঘটনায় তাঁদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সিজেপির এই দুই নেতার বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভস্থলে প্রবেশ, শান্তি রক্ষার মুচলেকা ভঙ্গ, নিষেধাজ্ঞা অমান্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই ঘটনায় আটক আরেক আন্দোলনকর্মী অজিঙ্কা শিন্দেকে ব্যক্তিগত মুচলেকায় মুক্তি দিয়েছেন আদালত। তবে দাস ও রানকা উচ্চতর আদালতে জামিনের আবেদন করতে পারবেন।

দিল্লিতে দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভ-সমাবেশের পরিচিত স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল যন্তর মন্তর। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পর পুলিশ অনুমোদিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে জায়গাটিকে বাদ দেয়। এর পরিবর্তে রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড ও সিবিডি গ্রাউন্ডকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারণ করা হয়। পুলিশের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সিজেপির নেতারা বলেছেন, এতে প্রতিবাদ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের নজরের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যন্তর মন্তরে ফিরে যান আন্দোলনকারীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দাস ও রানকাকে পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ভারতীয় পতাকা হাতে স্লোগান দিতে দেখা যায়। এর পরই তাঁদের আটক করা হয়। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘প্রতিরোধকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া যায় না।’

আন্দোলনকারীদের আইনজীবী দলের প্রধান রত্না সিং অভিযোগ করেছেন, গ্রেপ্তারের পর কয়েক ঘণ্টা তাঁদের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয় সময় রাত প্রায় তিনটার দিকে ব্যক্তিগত একটি গাড়িতে করে তাঁদের পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার জন্য সিজেপি নেতারা প্রকাশ্যে কোনো আহ্বান জানিয়েছিলেন—পুলিশের এমন অভিযোগও নাকচ করেছেন রত্না।

এর আগে গত সপ্তাহান্তে একই স্থানে বিক্ষোভের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে সিজেপির নেতাদের আটক করা হয়েছিল। ওই সময় সৌরভ দাস, আশুতোষ রঙ্কা, অজিঙ্কা শিন্দে ও অভিজিৎ দীপকেকে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁরা মুক্তি পান। ওই বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভকারী, সাংবাদিকসহ বহু মানুষকে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সিজেপি নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিরোধী রাজনীতিকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই গ্রেপ্তারকে ‘কাপুরুষোচিত কাজ’ বলে অভিহিত করেছেন। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার পক্ষে অবস্থান জানিয়ে তিনি এক্সে লিখেছেন, শিক্ষার্থী, তরুণ, সাংবাদিক ও বিরোধী জোটের কর্মীরা ভিন্ন ব্যানারে আন্দোলন করলেও তাঁদের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে সাংবিধানিক অধিকার।

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও সিজেপির নেতাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং গ্রেপ্তারের নিন্দা করেছেন। অন্যদিকে, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ তুলেছেন। বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লির পথে থাকা অবস্থায় তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জরুরি অবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার চ্যালেঞ্জ জানান। তাঁর মন্তব্যে ১৯৭০-এর দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে জারি করা জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে, যখন নাগরিক স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছিল।

সিজেপি মূলত একটি চাপ সৃষ্টিকারী আন্দোলনগোষ্ঠী; এটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। চলতি বছরের শুরুতে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে সংগঠনটির উত্থান। কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। পরে বেকারত্ব, পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সরকারের জবাবদিহির মতো বিষয়েও সংগঠনটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি গত ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে নতুন করে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। ভোটার তালিকা সংশোধন ও নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই কর্মসূচি জোরদার হয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি তুলেছিলেন। তবে নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রম। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) নির্বাচনী সুবিধা দিতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সিজেপি ও বিরোধী দলগুলো এখনো যৌথভাবে আন্দোলন না করলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গ্রেপ্তার এবং বিক্ষোভস্থল নির্ধারণ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন