- ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
আজারবাইজানের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। নতুন পোশাকবিধি কার্যকর হওয়ার পর দেশটির কয়েকটি স্কুলে হিজাব পরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থানের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন অনেকে। বিষয়টি ঘিরে বিক্ষোভের পাশাপাশি গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
বাকুর ইংরেজি শিক্ষক গুলশান আলিয়েভার কাছে বিতর্কটি এখন ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছে। ২৩ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চলতি সপ্তাহে মাথায় হিজাব পরে স্কুলে গেলে তাঁকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তাঁর মেয়েকেও বাকুর একটি স্কুলে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে আলজাজিরাকে জানিয়েছেন তিনি।
আলিয়েভা বলেন, তিনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কর্মজীবনে বাধার মুখে পড়তে চান না। শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেই তিনি শিক্ষকতা চালিয়ে যেতে চান।
তাঁর দাবি, আজারবাইজানের শ্রম আইনের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই ধর্মীয় পোশাকের কারণে তাঁকে কাজ করতে না দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, কাজ করা ও শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাবেন। তবে বাধা এলেও স্কুলে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন এই শিক্ষক।
গত মাসে আজারবাইজানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাকসংক্রান্ত নতুন নিয়ম চালু করা হয়। এতে সরাসরি হিজাবের নাম উল্লেখ না থাকলেও শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
নতুন নিয়মের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ৯০ শতাংশের বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ আজারবাইজানে বিষয়টি ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত অধিকার ও রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, নতুন বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে বাকু নগর শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, নতুন পোশাকবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে স্কুলগুলোতে নজরদারি চালানো হবে।
আজারবাইজানের ককেশাস মুসলিম বোর্ডের চেয়ারম্যান শেখ-উল-ইসলাম আল্লাহশুকুর পাশাজাদে হিজাবকে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মঙ্গলবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা না গেলেও নাগরিক হিসেবে মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন।
তবে স্কুলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে প্রতিবাদ জানানোর সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বাকুর বাসিন্দা তিমুর রজায়েভ মনে করেন, হিজাব নিয়ে বিতর্ককে অতিরিক্ত রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, সরকার যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট পোশাকবিধি চালু করেছে, তখন তা মেনে চলাই উচিত।
১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের হিজাব পরার বিষয়েও আপত্তি রয়েছে তাঁর। রজায়েভের যুক্তি, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের পোশাকের সিদ্ধান্ত অভিভাবকের পছন্দের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, শিশুর নিজের ইচ্ছায় নয়।
তিনি বলেন, আজারবাইজান একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মীয় মানুষের অধিকারকে সম্মান করা হয়। তবে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় চর্চা ও পোশাকের বিষয়টি নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়ে আজারবাইজানে ধর্মীয় চর্চার ওপর নানা বিধিনিষেধ ছিল। স্বাধীনতার পর এসব বিধিনিষেধ শিথিল হয় এবং মানুষ ধর্মীয় আচার পালনে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা পায়। বর্তমান বিতর্কে সেই স্বাধীনতার পরিধি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সীমা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
বিরোধী দল রিয়েল পার্টির প্রধান নাতিগ জাফারলি মনে করেন, স্কুলে শিক্ষার্থীদের হিজাব পরার বিষয়টি আরও আলোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সমঝোতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
তবে শিক্ষকদের পোশাক নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা করেছেন জাফারলি। তাঁর মতে, শিক্ষকরা প্রাপ্তবয়স্ক এবং তাঁরা কী পোশাক পরবেন, সে বিষয়ে এমন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা সঠিক পদ্ধতি নয়।
বিতর্কটি এখন আজারবাইজানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সঙ্গেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের নতুন পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মাথা ঢেকে রাখা কোনো শিক্ষার্থীকে স্কুলের ফটকে আটকে রাখা ন্যায়বোধ ও বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন নিউ আজারবাইজান পার্টি মঙ্গলবার সারালের মন্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছে। দলটির বক্তব্য, এ ধরনের মন্তব্য দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
অন্যদিকে আজারবাইজানের পার্লামেন্টের মানবাধিকার কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ অরুজ দাবি করেছেন, নতুন নিয়ম ধর্মীয় বৈষম্য বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়। তাঁর ভাষ্য, স্কুলের বাইরে হিজাব পরার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিন্ন পোশাকবিধি বজায় রাখাই এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।
তিনি আরও বলেন, আজারবাইজানের অনেক মানুষ হিজাব পরেন না, কিন্তু পবিত্র কোরআনকে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মানেন এবং সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন। তাই স্কুলের পোশাকবিধি নিয়ে মতভিন্নতাকে ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
দেশটির জাতীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর ফোরামও বিতর্কটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সমালোচনা করেছে।
আজারবাইজানের সংবিধানে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথক অবস্থান এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকদের বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারি স্কুলে পোশাকের নিয়ম নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি এবং ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা দুই সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আজারবাইজানভিত্তিক সামাজিক গবেষণা সংগঠন টলারেন্স পাবলিক অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আজার রাশিদোগলু মনে করেন, নতুন নিয়ম সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন, তাঁদের আইনি প্রতিকার চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
রাশিদোগলুর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সম্মিলিতভাবে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এবং শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত পথে নিজেদের দাবি তুলে ধরা উচিত।
হিজাব নিয়ে আজারবাইজানের এই বিতর্কে এখন মূল প্রশ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিন্ন পোশাকবিধি বজায় রাখার নামে রাষ্ট্র কতটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, আর ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় তার দায়িত্ব কতটুকু। একদিকে স্কুলের ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখার দাবি, অন্যদিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও কর্মজীবন অব্যাহত রাখার অধিকার এই দুইয়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করাই এখন দেশটির কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।