Sunday, October 18, 2026

চাক বেরির জন্মশতবর্ষ আজ, যে গিটারের সুর বদলে দিয়েছিল রকসংগীতের ইতিহাস


ফাইল ছবিঃ চাক বেরি (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

একটি গানের কয়েকটি গিটার নোট কখনো কখনো বদলে দিতে পারে একজন মানুষের জীবন। নতুন করে গিটার হাতে নেওয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারে হাজারো তরুণকে। মার্কিন সংগীতশিল্পী চাক বেরির ‘জনি বি. গুড’ তেমনই একটি গান। গিটার বাজানোর আকাঙ্ক্ষা, তরুণ বয়সের দুরন্তপনা আর নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্প সব মিলিয়ে গানটি কয়েক প্রজন্মের সংগীতপ্রেমীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

শুধু শ্রোতার হৃদয়েই নয়, পৃথিবীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর সংগীত। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ মহাকাশযানের সঙ্গে পাঠানো গোল্ডেন রেকর্ডে স্থান পেয়েছে ‘জনি বি. গুড’। পৃথিবীর সংগীত ও সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী নির্বাচিত সৃষ্টিগুলোর মধ্যে জায়গা করে নেওয়া গানটি যেন মহাকাশেও পৌঁছে দিয়েছে রক অ্যান্ড রোলের স্পন্দন।

আজ ১৮ অক্টোবর চাক বেরির জন্মের এক শ বছর পূর্ণ হলো। ১৯২৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পুরো নাম চার্লস এডওয়ার্ড অ্যান্ডারসন বেরি। গায়ক, গীতিকার ও গিটারবাদক তিন পরিচয়েই সংগীতের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। বিশেষ করে ব্লুজ, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ ও কান্ট্রি সংগীতের বিভিন্ন উপাদানকে একসূত্রে গেঁথে রক অ্যান্ড রোলকে স্বতন্ত্র রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য।

রক অ্যান্ড রোল কোনো একক শিল্পীর হাতে তৈরি হয়নি। নানা সংগীতধারা ও শিল্পীর অবদানে গড়ে ওঠা এই ধারাকে চাক বেরি দিয়েছিলেন আলাদা বৈশিষ্ট্য। তাঁর গিটারের ঝলমলে সুর, প্রাণবন্ত ছন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনের গল্পনির্ভর গানের কথা শ্রোতাদের কাছে তাঁকে দ্রুত পরিচিত করে তোলে। পরবর্তী সময়ে তাঁর এই সংগীতরীতি অসংখ্য গিটারবাদক ও রকশিল্পীর জন্য অনুসরণীয় হয়ে ওঠে।

সেন্ট লুইসের বিভিন্ন ক্লাবে গান বাজানোর মধ্য দিয়ে সংগীতজগতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেন বেরি। ১৯৫৩ সালে তিনি পিয়ানোবাদক জনি জনসনের দল স্যার জনস ট্রিওতে যোগ দেন। নিয়মিত পরিবেশনার অভিজ্ঞতা তাঁকে শ্রোতাদের পছন্দ বুঝতে সাহায্য করে। ব্লুজের সঙ্গে কান্ট্রি সংগীতের উপাদান মিলিয়ে তিনি এমন একটি ধারা তৈরি করেন, যা ভিন্ন বর্ণ ও সাংস্কৃতিক পটভূমির শ্রোতাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।

তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা ঘটে ১৯৫৫ সালে। শিকাগোয় ব্লুজশিল্পী মাডি ওয়াটার্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রেকর্ড প্রকাশের বিষয়ে পরামর্শ চান বেরি। ওয়াটার্স তাঁকে চেস রেকর্ডসের লিওনার্ড চেসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সেই সূত্রেই প্রকাশিত হয় ‘মেবেলিন’। গানটি যুক্তরাষ্ট্রের রিদম অ্যান্ড ব্লুজ তালিকায় শীর্ষস্থান অর্জন করে এবং পপ সংগীতের তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে পৌঁছায়। স্থানীয় ক্লাবের পরিচিতি পেরিয়ে বেরি তখন জাতীয় পর্যায়ের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যান।

‘মেবেলিন’-এর সাফল্যের পর একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দেন চাক বেরি। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘রোল ওভার বিটোফেন’। পরের বছর আসে ‘স্কুল ডেজ’ ও ‘রক অ্যান্ড রোল মিউজিক’। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ‘সুইট লিটল সিক্সটিন’ এবং ‘জনি বি. গুড’ তাঁর জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করে।

এসব গানের বিশেষত্ব ছিল তরুণদের চেনা জীবনকে সংগীতের ভাষায় তুলে ধরা। স্কুল, প্রেম, নাচ, বন্ধুত্ব এবং বড় হয়ে ওঠার স্বপ্ন সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর গানে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। বয়সে কিশোর না হলেও তরুণদের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা ধরতে পারতেন তিনি। ফলে তাঁর গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছিল একটি প্রজন্মের অনুভূতি প্রকাশের ভাষা।

গানের পাশাপাশি মঞ্চে তাঁর উপস্থিতিও ছিল ব্যতিক্রমী। গিটার বাজাতে বাজাতে হাঁটু ভাঁজ করে শরীর নিচু করে এগিয়ে যাওয়ার যে ভঙ্গি তিনি জনপ্রিয় করেছিলেন, তা ‘ডাক ওয়াক’ নামে পরিচিতি পায়। গিটারের সুর, শরীরী অভিব্যক্তি ও ছন্দময় চলাফেরার সমন্বয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন তিনি। রকসংগীতে গিটারবাদকের মঞ্চপরিবেশনা যে স্বতন্ত্র আকর্ষণ তৈরি করতে পারে, তা প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবিভক্ত সমাজেও তাঁর সংগীত তৈরি করেছিল নতুন সংযোগ। কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতের ঐতিহ্য থেকে উঠে আসা বেরির গান শ্বেতাঙ্গ তরুণদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা পায়। সংগীতের প্রতি ভালোবাসা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন অতিক্রম করতে পারে তাঁর জনপ্রিয়তা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

চাক বেরির সংগীতের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আটলান্টিক পেরিয়ে ব্রিটিশ সংগীতজগতেও তাঁর গান ছড়িয়ে পড়ে। বিটলস ও রোলিং স্টোনসের মতো জনপ্রিয় ব্যান্ড তাঁর গান পরিবেশন করেছে। পরবর্তী প্রজন্মের বহু গিটারবাদকও তাঁর বাজানোর ধরন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।

বিটলসের সদস্য জন লেনন একবার বলেছিলেন, রক অ্যান্ড রোলকে অন্য কোনো নামে ডাকতে হলে সেটি হতে পারে চাক বেরি। মন্তব্যটি রকসংগীতের বিকাশে বেরির প্রভাব কতটা গভীর ছিল, তারই ইঙ্গিত দেয়।

দক্ষিণ এশিয়াতেও তাঁর সংগীত পৌঁছেছে বিভিন্ন পথে। কেউ সরাসরি তাঁর রেকর্ড শুনে পরিচিত হয়েছেন, আবার কেউ বিটলস কিংবা রোলিং স্টোনসের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁর গান আবিষ্কার করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সংগীতশিল্পী অঞ্জন দত্তের অনুপ্রেরণার তালিকাতেও চাক বেরির নাম রয়েছে বলে ২০১০ সালে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

ভারতীয় গিটারবাদক আয়ুষী কার্নিকের অভিজ্ঞতাও এই প্রভাবের বিস্তারের একটি উদাহরণ। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, বিটলসের পরিবেশনায় চাক বেরির গান শুনতেন। পরে বেরির সংগীত খুঁজতে গিয়ে পরিচিত হন মাডি ওয়াটার্সের ব্লুজের সঙ্গেও। এভাবে একটি ব্যান্ডের গান তাঁকে নিয়ে যায় রক অ্যান্ড রোলের শিকড়ের দিকে।

ভারতের ব্যান্ড দ্য রিটর্নেলোসের সদস্য নিকোলাস রিক্সনও ছোটবেলার একটি স্মৃতিতে বেরির প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন। ‘১০১ ইন্ডিয়া’য় লেখা তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক আত্মীয়ের নিয়ে আসা ক্যাসেটে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রথম চাক বেরির গান শোনেন তিনি। ‘জনি বি. গুড’-এর গিটার বাজতে শুরু করলে উপস্থিত সবাই নাচতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে নিজের ব্যান্ডের সংগীতচর্চার ক্ষেত্রেও বেরি ও রক অ্যান্ড রোলের প্রভাব অনুভব করেছেন তিনি।

বাংলাদেশে ব্যান্ডসংগীতের বিকাশের ইতিহাসেও পাশ্চাত্যের রক অ্যান্ড রোলের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন শিল্পীদের হাত ধরে বিকশিত এই সংগীতধারা পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শিল্পীদের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের কাছে আরও পরিচিত হয়ে ওঠে। রেডিও সিলোনের ‘প্যারাডাইস আইল্যান্ড’ অনুষ্ঠানের মতো সম্প্রচারমাধ্যম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তরুণদের পশ্চিমা সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল।

২০২৩ সালের ২ জুলাই ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ সোলস ব্যান্ডের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত আসরার চৌধুরীর একটি নিবন্ধে এই সাংস্কৃতিক পটভূমির আলোচনা রয়েছে। পাশ্চাত্য গান শোনার অভ্যাস কীভাবে স্থানীয় ব্যান্ডসংগীতের বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল, নিবন্ধটিতে তা তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ আজম খানের সঙ্গে চাক বেরির তুলনাও করেছেন কেউ কেউ। ২০১১ সালে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত এক লেখায় আসরার চৌধুরী তাঁদের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য তুলে ধরেন। দুই শিল্পীই নিজেদের সময়ের তরুণদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে গানের বিষয় করে তুলেছিলেন। মানুষের পরিচিত জীবন, স্থান ও সামাজিক বাস্তবতা তাঁদের গানে পেয়েছিল আলাদা গুরুত্ব।

তবে এই তুলনাকে আজম খানের ওপর চাক বেরির সরাসরি প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ভিন্ন দুই সমাজে দাঁড়িয়ে তরুণদের জন্য নিজস্ব সংগীতভাষা তৈরির ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকার মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

চাক বেরির জীবন ছিল সাফল্যের পাশাপাশি নানা বিতর্ক ও সংকটে ঘেরা। কারাবাস ও আইনি জটিলতা তাঁর সংগীতজীবনে বাধা সৃষ্টি করেছে। জনপ্রিয়তারও উত্থান-পতন ছিল। কিন্তু এসবের পরও তাঁর গান ও গিটার বাজানোর ধরন পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে প্রাসঙ্গিক থেকেছে।

তাঁর ক্যারিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের পপ সিঙ্গেলস তালিকায় তাঁর একমাত্র শীর্ষস্থান পাওয়া গান ‘মাই ডিং-আ-লিং’, যা ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। অথচ রকসংগীতে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানের আলোচনায় ‘জনি বি. গুড’ ও ‘রোল ওভার বিটোফেন’-এর মতো গানই বেশি গুরুত্ব পায়। এতে বোঝা যায়, কোনো গানের তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক সাফল্য দিয়ে সংগীতের ইতিহাসে তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সব সময় পরিমাপ করা যায় না।

১৯৮৪ সালে রেকর্ডিং একাডেমি তাঁকে আজীবন সম্মাননা গ্র্যামি পুরস্কার দেয়। এর দুই বছর পর, ১৯৮৬ সালে, রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমের প্রথম অন্তর্ভুক্ত শিল্পীদের একজন হন তিনি। অনুষ্ঠানে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন রোলিং স্টোনসের গিটারবাদক কিথ রিচার্ডস—যিনি নিজেও বেরির সংগীত থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

২০১৭ সালের ১৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট চার্লস কাউন্টিতে নিজের বাড়িতে মারা যান চাক বেরি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। মৃত্যুর কয়েক মাস পর, একই বছরের ৯ জুন, প্রকাশিত হয় তাঁর শেষ স্টুডিও অ্যালবাম ‘চাক’। আগের স্টুডিও অ্যালবামের প্রায় ৩৮ বছর পর নতুন অ্যালবাম নিয়ে শ্রোতাদের সামনে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই অ্যালবামের প্রকাশ দেখে যেতে পারেননি।

চাক বেরি আজ আর নেই। তবে তাঁর গিটারের সুর, তরুণদের জীবনের গল্প আর মঞ্চে সেই অনন্য ‘ডাক ওয়াক’ রকসংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। জন্মের এক শতাব্দী পরও ‘জনি বি. গুড’ নতুন কাউকে গিটার হাতে তুলে নিতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। আর সেখানেই হয়তো একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য তাঁর সংগীত থেমে যায় না, বরং নতুন প্রজন্মের হাতে নতুন করে বেঁচে থাকে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন