- ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
গিটার হাতে বিশাল এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন আইয়ুব বাচ্চু। সামনে ১৫ লাখ দর্শক, চারদিকে গিটারের সুর আর গানের উচ্ছ্বাস। একই মঞ্চে দেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি থাকবেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গিটারবাদকেরাও। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এমন একটি কনসার্ট আয়োজনের স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি এই শিল্পী। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।
শুধু বিশাল কনসার্ট নয়, নতুন প্রজন্মের গিটারবাদকদের নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং একটি গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। নিজের সংগ্রহে থাকা গিটারগুলো নতুন শিল্পীদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে থেমে যায় সেই উদ্যোগগুলোর পথচলা। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে আট বছর। তাঁর গান এখনো শ্রোতাদের মনে জায়গা করে আছে, আর তাঁর স্বপ্নগুলো রয়ে গেছে অপূর্ণ।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু আজ বেঁচে থাকলে বয়স হতো ৬৪ বছর। হয়তো নতুন গান তৈরি করতেন, তরুণ সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতেন কিংবা গিটার হাতে দাঁড়িয়ে যেতেন তাঁর বহুদিনের আকাঙ্ক্ষার সেই বিশাল মঞ্চে। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে এসব কেবলই কল্পনা। বাস্তবে রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টি, স্মৃতি আর নতুনদের জন্য কিছু করে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
আইয়ুব বাচ্চুর কাছে গিটার ছিল শুধু সংগীত পরিবেশনের একটি যন্ত্র নয়; এটি ছিল তাঁর নিজস্ব পরিচয়ের অন্যতম অংশ। গিটারের তারে সুর তুলে তিনি যেমন শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন, তেমনি বাংলা ব্যান্ডসংগীতে গিটারবাদনের স্বতন্ত্র একটি ধারা প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রেখেছেন।
নিজের সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন গিটারবাদক তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। নবীনদের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের ইচ্ছা ছিল তাঁর। প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার হিসেবে নিজের সংগ্রহের গিটারগুলো দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। যে বাদ্যযন্ত্রগুলো নিয়ে বছরের পর বছর মঞ্চ মাতিয়েছেন, সেগুলোই একসময় নতুন শিল্পীদের হাতে বাজবে—এমন একটি ভাবনা ছিল তাঁর পরিকল্পনার অংশ। তবে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়নি।
একই সঙ্গে একটি গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও ছিল আইয়ুব বাচ্চুর। সেখানে শুধু গিটার নয়, অন্য বাদ্যযন্ত্র শেখারও সুযোগ রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য ছিল, আগ্রহী তরুণেরা যেন নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারেন এবং সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেন।
এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পী তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ পেতেন। সংগীতচর্চার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশও তৈরি হতো। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই বিদায় নেন এই শিল্পী।
আইয়ুব বাচ্চুর মঞ্চ পরিবেশনার অন্যতম আকর্ষণ ছিল তাঁর গিটারবাদন। গানের পাশাপাশি দীর্ঘ গিটার একক পরিবেশনায়ও তিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন। তাঁর কাছে মঞ্চ ছিল নিজের সংগীতভাবনা প্রকাশের জায়গা।
এক আড্ডায় নিজের স্বপ্নের কনসার্ট নিয়ে কথা বলেছিলেন তিনি। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সেখানে দেশি-বিদেশি শিল্পীরা একই মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করবেন এমনটাই চেয়েছিলেন তিনি।
বিদেশি শিল্পীদের মধ্যে মার্কিন গিটারবাদক স্টিভ ভাই, জো সাত্রানি ও কার্লোস সান্টানার নাম উল্লেখ করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। ব্রিটিশ ড্রামার আয়েন পেজকেও এই আয়োজনের অংশ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। দেশীয় শিল্পীদের মধ্যে তাঁর ভাবনায় ছিলেন জেমস, বেজবাবা সুমন ও মানাম আহমেদ।
স্বপ্নের কনসার্টের ব্যাপ্তি বোঝাতে তিনি বলেছিলেন, “আমরা একটা স্লট বাজাব, ঘণ্টা তিনেক ধরে। আর দর্শক থাকবে ১৫ লাখ। তাহলে সেটা হবে স্বপ্নের কনসার্ট।”
কথাগুলোতে ছিল বড় পরিসরে সংগীত উদ্যাপনের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই আয়োজন আর করা হয়নি। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিপুলসংখ্যক দর্শকের সামনে গিটার হাতে দাঁড়ানোর স্বপ্নটি তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই অপূর্ণ থেকে যায়।
ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি আগ্রহ ছিল আইয়ুব বাচ্চুর। বাবার কাছ থেকে প্রথম গিটার পাওয়ার পর শুরু হয় তাঁর চর্চা। পরে নিয়মিত অনুশীলন ও নিজের চেষ্টায় তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম পরিচিত গিটারবাদক।
সংগীতজীবনের শুরুতে বিভিন্ন ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। পরে যুক্ত হন জনপ্রিয় ব্যান্ড সোলসে। সেখানে গিটারবাদক হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও পরিচিতি পান।
১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল নিজের ব্যান্ড গঠন করেন আইয়ুব বাচ্চু। শুরুতে এর নাম ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড, যা পরে লাভ রানস ব্লাইন্ড বা এলআরবি নামে পরিচিতি পায়। এই ব্যান্ডের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয়।
‘সেই তুমি’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘রুপালি গিটার’, ‘ফেরারি মন’ ও ‘এখন অনেক রাত’-এর মতো গান আজও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। তাঁর সংগীতে রক, ব্লুজ ও মেলোডির মিশ্রণ শ্রোতাদের আলাদা অভিজ্ঞতা দিয়েছে। গিটারকে কেবল গানের সঙ্গত হিসেবে নয়, নিজের অনুভূতি প্রকাশের স্বতন্ত্র মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছেন তিনি।
তাঁর গান এক প্রজন্মের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও সেগুলো শুনছেন, গাইছেন এবং নিজেদের মতো করে পরিবেশন করছেন।
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যবহৃত গিটার ও সংগীতজীবনের স্মারকগুলো সংরক্ষণের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা অধ্যায়।
এসব গিটার যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে। তাঁর ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, গানের পাণ্ডুলিপি, ছবি, সাক্ষাৎকার ও সংগীতজীবনের অন্যান্য স্মারক নিয়ে গড়ে উঠতে পারে একটি সংগ্রহশালা। একই সঙ্গে তাঁর গান, গিটারবাদনের ভিডিও ও সাক্ষাৎকার নিয়ে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাঁর কাজগুলো সহজে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
আইয়ুব বাচ্চুর ২৭২টি গান সংরক্ষণ ও ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরির উদ্যোগের কথাও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল। এমন উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তাঁর সৃষ্টির স্থায়ী সংরক্ষণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাঁর স্বপ্নের গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেখানে তরুণদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাঁর সংগীতচর্চা ও গিটারবাদনের কৌশল নিয়ে নিয়মিত কর্মশালা আয়োজনের সুযোগ থাকবে। তাঁর সংগ্রহের গিটারগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা রেখে বিশেষ প্রদর্শনী বা শিক্ষামূলক কার্যক্রমে ব্যবহার করা গেলে নতুনদের সঙ্গে তাঁর সংগীতঐতিহ্যের সংযোগ তৈরি হতে পারে।
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর আট বছর পরও তাঁর গান সংগীতাঙ্গনে আলোচিত। শিল্পীরা তাঁর গান পরিবেশন করেন, তরুণ গিটারবাদকেরা তাঁর বাজানোর ধরন থেকে অনুপ্রেরণা নেন। তাঁর সংগীতজীবনের প্রভাব যে এখনো বিদ্যমান, এসব তারই প্রমাণ।
২০২৬ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা এ সম্মান প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, “বাচ্চু থাকলে বেশি খুশি হতো। পুরস্কারটা নিজে হাতে নিতে পারলে খুশি হতো।”
সম্মাননা ও স্মরণ আয়োজনের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর গান সংরক্ষণ, সংগীতচর্চার সুযোগ তৈরি এবং নতুন শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তাঁর স্বপ্নের কিছু অংশ বাস্তবায়ন সম্ভব।
হয়তো কোনো একদিন নতুন কোনো গিটারবাদক তাঁর ব্যবহৃত গিটার হাতে নিয়ে সুর তুলবেন। হয়তো তাঁর স্বপ্নের গিটার স্কুলে প্রথমবারের মতো কেউ গিটার শেখা শুরু করবে। আর হয়তো কোনো বড় কনসার্টে হাজারো দর্শক একসঙ্গে গাইবেন তাঁরই গান।
আইয়ুব বাচ্চু নেই, কিন্তু তাঁর সংগীত রয়ে গেছে। তাঁর অপূর্ণ স্বপ্নগুলোও মনে করিয়ে দেয়, একজন শিল্পীর উত্তরাধিকার শুধু তাঁর গানে সীমাবদ্ধ নয়; নতুনদের জন্য রেখে যাওয়া স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মধ্যেও তা বেঁচে থাকে।