Monday, January 19, 2026

বাংলাদেশে সামরিক ড্রোন কারখানা স্থাপনে চীনের বিনিয়োগ, দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত বার্তা


ছবিঃ ড্রোন (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

বাংলাদেশে সামরিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চীনের সহায়তায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বেইজিংয়ের প্রভাব আরও দৃশ্যমান করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া এই সরকার-থেকে-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে থাকছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। প্রকল্পে প্রযুক্তি সরবরাহ করবে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (সিইটিসি), যারা রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা ও ড্রোন প্রযুক্তিতে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে— “মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি) উৎপাদন কারখানা স্থাপন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর”। এর মধ্যে প্রায় ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয় হবে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিতে। চলতি অর্থবছরে প্রথম ধাপে বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ১০৬ কোটি টাকা।

যদিও সরকারি নথিতে নির্দিষ্ট কোনো ড্রোনের নাম উল্লেখ নেই, তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা—এই কারখানায় মূলত চীনের উইং লুং–২ শ্রেণির মাঝারি উচ্চতার দীর্ঘস্থায়ী সক্ষমতাসম্পন্ন (MALE) সশস্ত্র ড্রোন উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই ড্রোনগুলো নজরদারি ও আঘাত হানার সক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের খবরে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিকটবর্তী বাংলাদেশে চীনা সামরিক প্রযুক্তির উপস্থিতি দিল্লির কৌশলগত স্বস্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছেন। ২০২৫ সালের মার্চে তাঁর চীন সফরের সময় একাধিক বড় চুক্তি সই হয়, যার ধারাবাহিকতায় এই ড্রোন কারখানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকার দাফোদিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মো. ওবায়দুল্লাহ বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চাহিদা পূরণে ভারত কার্যকর বিকল্প দিতে না পারায় দেশটি চীনের দিকে ঝুঁকছে।” তাঁর মতে, কেবল আপত্তি জানানো নয়, বরং যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাবই হতে পারে ভারতের জন্য বাস্তবসম্মত পথ।

এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলেন, সবকিছু চূড়ান্ত হলে তখন প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কারখানা শুধু একটি শিল্পপ্রকল্প নয়; বরং এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং কৌশলগত অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রভাব যে বাংলাদেশেও পড়ছে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন এই উদ্যোগ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শক্তির ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন