Monday, October 19, 2026

বাবার শেখানো শিল্পেই সংসার চালান যুথি, তবু স্বপ্ন দেখেন ভাস্কর হওয়ার


ফাইল ছবিঃ যুথি মনি (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। শেরপুর

যে বয়সে বাবার হাত ধরে পূজামণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে যুথি মনি পালকে। দুর্গাপূজার আনন্দ উপভোগ করার বদলে এখন এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ছুটছেন তিনি। উদ্দেশ্য, নিজের হাতে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহের বকেয়া টাকা সংগ্রহ করা। বাবার কাছ থেকে শেখা শিল্পকর্মই এখন তার পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তবে সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে পুরোপুরি বিসর্জন দিতে রাজি নন এই তরুণী। তার ইচ্ছা, একদিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়বেন, প্রতিষ্ঠিত হবেন একজন ভাস্কর্যশিল্পী হিসেবে।

শেরপুর সদর উপজেলার ভাতশালা ইউনিয়নের বয়রা পরানপুর পালপাড়া গ্রামের যুথি এ বছর নিজের হাতে তৈরি করেছেন ১৮টি দুর্গাপ্রতিমা। সদ্য এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এই তরুণীর উপার্জনেই চলছে মা ও ছোট বোনের সংসার। তাদের দৈনন্দিন খরচের পাশাপাশি পড়াশোনার ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে তাকে।

যুথির বাবা দীপক কুমার পাল ছিলেন প্রতিমাশিল্পী। বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরি ও মাটির বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির কাজ করতেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে থেকে প্রতিমা তৈরির নানা কৌশল শিখেছেন যুথি। খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি, মাটি দিয়ে প্রতিমার অবয়ব গড়া, রং করা থেকে শুরু করে সাজসজ্জা ধীরে ধীরে সব কাজেই দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি।

তখন হয়তো ভাবেননি, বাবার কাছ থেকে শেখা সেই কাজই একদিন পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রধান ভরসা হয়ে উঠবে।

২০২৪ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীপক কুমার পালের মৃত্যু হলে পরিবারটি কঠিন সংকটে পড়ে। স্বামীকে হারিয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন স্ত্রী রেখা রানী পাল। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারানোর পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে তার।

এমন পরিস্থিতিতে বাবার কাজের হাল ধরেন যুথি। নিজের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন এক পাশে রেখে পরিবারের দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দেন তিনি। বাবার কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন পুরোদমে।

তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগে। মেজ মেয়ে যুথি এবার শহরের মডেল গার্লস ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ছোট মেয়ে প্রিয়াঙ্কা রানী পাল স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে।

বাবার মৃত্যুর পর গত দুই বছরে প্রতিমা তৈরির কাজে মোটামুটি ভালো সাড়া পেয়েছেন যুথি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৮টি প্রতিমা তৈরির কাজ নেন তিনি। কাজের চাপ সামলাতে তিনজন কারিগরও নিয়োগ করেন। তাদের প্রত্যেককে মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দিতে হয়।

পূজার আগে বিভিন্ন মণ্ডপের লোকজন প্রতিমাগুলো নিয়ে গেলেও সব টাকা এখনো পরিশোধ করেননি। ফলে নিজের শ্রমের পাওনা বুঝে নিতে প্রতিদিন বিভিন্ন পূজামণ্ডপে যেতে হচ্ছে যুথিকে। তার আশা, পূজা শেষ হওয়ার আগেই বকেয়া টাকা হাতে পাবেন।

এই টাকা শুধু তার ব্যক্তিগত উপার্জন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো পরিবারের জীবনযাপন। সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি মা ও ছোট বোনের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও তার কাঁধে।

যুথি মনি পাল বলেন, ‘আমার খুব স্বপ্ন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়ব এবং একজন ভাস্কর্যশিল্পী হব। কিন্তু হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা অথৈ জলে পড়ে যাই। নিজের সেই স্বপ্নকে বুকে চেপে বাবার কাজের হাল ধরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত দুই বছরে মোটামুটি বেশ ভালো প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছি। তা দিয়েই সংসার টিকিয়ে রেখেছি। সংসার চালানোর পাশাপাশি আমার, মা ও ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও এখান থেকে চালাতে হচ্ছে।’

এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অন্য শিক্ষার্থীদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল যুথির। কিন্তু দুর্গাপ্রতিমা তৈরির ব্যস্ততায় সেই প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় তিন মাস ধরে দিন-রাত পরিশ্রম করে প্রতিমা তৈরি করায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিংয়েও ভর্তি হতে পারেননি তিনি।

তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আশা ছাড়েননি যুথি। হাতে থাকা সময়টুকু কাজে লাগিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে চান। এ জন্য ভর্তি-সহায়ক বই পড়ে নিজেই পড়াশোনা করার পরিকল্পনা করছেন।

যুথির ভাষায়, ‘ভাবছি, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি গাইড পড়ে এভাবেই পরীক্ষা দেব। যেটুকু সময় আছে, এর মধ্যেই চেষ্টা চালিয়ে যাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য। বাকিটা ভগবানের ইচ্ছা।’

পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাবার রেখে যাওয়া প্রতিমা তৈরির কাজও চালিয়ে যেতে চান তিনি। তার প্রত্যাশা, একদিন নিজের স্বপ্ন পূরণ করে শিল্পী হিসেবে আলাদা পরিচয় গড়ে তুলবেন।

অন্যদিকে, মেয়ের সংগ্রাম দেখে একদিকে যেমন গর্ববোধ করেন রেখা রানী পাল, তেমনি বুকের ভেতর জমে আছে স্বামীকে হারানোর বেদনা। দুর্গাপূজার সময় একসময় স্বামী তিন মেয়ের হাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতেন। প্রতিমা দেখাতেন, পূজার আনন্দ ভাগ করে নিতেন সন্তানদের সঙ্গে। সেই দিনগুলো এখন তার কাছে কেবলই স্মৃতি।

রেখা রানী পাল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এই পূজার সময় আমার তিন মেয়েকে হাতে ধরে তাদের বাবা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে পূজা দেখাতেন। কিন্তু তাদের বাবা মারা যাওয়ার পর সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।’

মেয়ের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এইটুকু কচি বাচ্চার হাতে খড়-মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করতে দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। তারপরও করার কিছু নেই। ভগবানই দেখবেন—এই আশা নিয়েই বেঁচে আছি।’

বাবার শেখানো শিল্পে সংসারের হাল ধরে রাখা যুথির পথচলা এখনো সহজ নয়। একদিকে পরিবারের দায়িত্ব, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যেতে চান তিনি। প্রতিমার মাটিতে যেমন ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন দেবীর অবয়ব, তেমনি নিজের জীবনও নতুন করে গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছেন এই তরুণী।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন