- ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
সাধারণ এক কিশোরের মতোই চেয়ারে বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল ১৩ বছরের ওমর হালাওয়া। কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি—তার আর দুটি পা নেই, একটি পা তিন মাস আগেই হারিয়েছে সে। চেয়ারে ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে যায় ওমর। দৃশ্যটি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তার মা ইয়াসমিন হালাওয়া।
২০২৫ সালের ১ অক্টোবর উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায় পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে গুরুতর আহত হয় ওমর। তার সঙ্গে ছিল ১১ বছরের বোন লায়ান, ১৩ বছরের চাচাতো ভাই মোয়াজ হালাওয়া ও সমবয়সী বন্ধু মোহাম্মদ আল সিকসিক। গোলার আঘাতে ওমরের ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ওই হামলায় তার বন্ধু ও চাচাতো ভাই নিহত হন।
ইয়াসমিন হালাওয়া জানান, দক্ষিণে সরে যাওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের ছিল না। একটি গাড়ি ভাড়া করতে লাগত ছয় হাজার শেকেল, যা তাদের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পরিবারটি ১৫ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। উত্তর গাজায় বিশুদ্ধ পানির সংকট এতটাই তীব্র ছিল যে ভোরের আগেই শিশুরা লাইনে দাঁড়াতে বের হয়েছিল।
অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই ওমর তার বন্ধু ও চাচাতো ভাইয়ের খোঁজ করে। পরে জানতে পারে তারা আর বেঁচে নেই। পরিবারের সদস্যরা তার বিচ্ছিন্ন পাটি তাঁবুর পাশে কবর দেন। প্রতিদিন সেই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ওমর বলে, “আমার পা আমার আগেই জান্নাতে চলে গেছে।”
ওমরের মতো হাজারো শিশু গাজায় যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার। ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজারই শিশু। আহত হয়েছে আরও প্রায় ৪২ হাজার শিশু, যাদের অনেকেরই ক্ষত আজীবনের। অন্তত ৩৯ হাজার শিশু এক বা দুই অভিভাবক হারিয়ে অনাথ হয়ে পড়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় অনাথ সংকট বলে মনে করা হচ্ছে।
ইউনিসেফের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজায় শিশু মৃত্যুর ঘটনা থামেনি। সংস্থাটির এক মুখপাত্র জানান, চার হাজারের বেশি শিশু এখনো জরুরি চিকিৎসা ও বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। টানা অবরোধের কারণে অপুষ্টি ও অনাহার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ শিশু অপুষ্টিতে মারা গেছে।
জাবালিয়ার তাঁবুতে থাকা আরেক ১৩ বছরের কিশোরী রাহাফ আল নাজ্জারও যুদ্ধের শিকার। গত বছর খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরায়েলি ড্রোনের গুলিতে তার দুই পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তার সেরে ওঠা ধীরগতির। রাহাফের মা জানান, সপ্তাহে মাত্র কয়েকটি ডিম জোগাড় করতে পারেন তিনি, মাংস বা মাছ কেনার সামর্থ্য নেই।
রাহাফ তার বাবাকেও হারিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে জাবালিয়া ক্যাম্পে ড্রোন হামলায় নিহত হন তিনি। আহত অবস্থায় বাবার শেষ নিঃশ্বাস নিজের কোলে নিতে হয়েছিল রাহাফকে। সেই স্মৃতি আজও তাকে তাড়া করে ফেরে।
শিক্ষাব্যবস্থাও বিপর্যস্ত। গাজার শিক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত। যেগুলো অক্ষত আছে, সেগুলোও এখন আশ্রয়কেন্দ্র। ফলে শিশুদের পড়াশোনা চলছে তাঁবুতে, তাও সীমিত উপকরণ নিয়ে।
শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকা, সহিংসতা প্রত্যক্ষ করা ও অনাহারের কারণে গাজার শিশুরা গভীর মানসিক আঘাতে ভুগছে। অনেকের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, দুঃস্বপ্ন, স্মৃতিভ্রংশ, আচরণগত পরিবর্তন ও ভয় কাজ করছে।
ওমরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। রাতে সে প্রায়ই চিৎকার করে উঠে বসে, মনে হয় যেন হারানো পাটি আবার ফিরে এসেছে। তবু তার স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে। কৃত্রিম পা পেলে সে আবার ফুটবল খেলতে চায়, সমুদ্রে সাঁতার কাটতে চায়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় এই শিশুদের জীবন আজ অস্তিত্বের লড়াই। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, দ্রুত মানবিক সহায়তা ও স্থায়ী শান্তি না এলে একটি পুরো প্রজন্ম হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাস্তব হয়ে উঠছে।