Sunday, October 11, 2026

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট চরমে, চারজনের কক্ষে থাকছেন ১০ শিক্ষার্থী


প্রতীকী ছবিঃ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। কুমিল্লা

টিউশনি কিংবা পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতে। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকলে নিরাপত্তার দুশ্চিন্তা, আর আবাসিক হলে উঠলেও মিলছে না স্বস্তি। চারজনের জন্য নির্ধারিত কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে আট থেকে ১০ জনকে। কারও ঠাঁই হচ্ছে মেঝেতে, আবার কারও জুটছে না পড়ার জন্য একটি টেবিলও। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের চিত্র এখন এমনই।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে একদিকে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা, ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাপন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ হাজার ৪৮৪। তাঁদের জন্য পাঁচটি আবাসিক হলে নির্ধারিত আসন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৯টি। সে হিসাবে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১৯ দশমিক ১১ শতাংশের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাকি ৫ হাজার ২৪৫ জন, অর্থাৎ ৮০ দশমিক ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের নির্ধারিত আসনের বাইরে রয়েছেন।

তবে রেজিস্ট্রার দপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, পাঁচটি হলে নির্ধারিত আসনের বিপরীতে অবস্থান করছেন ১ হাজার ৫৬২ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, আসনসংখ্যার চেয়ে ৩২৩ জন বেশি শিক্ষার্থী হলে থাকছেন।

হলভিত্তিক হিসাবে, কাজী নজরুল ইসলাম হলে ১৮০টি আসনের বিপরীতে থাকছেন ২১০ জন। বিজয়-২৪ হলে ৪৬০টি আসনের বিপরীতে ৫২০ জন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে ১৪৬টি আসনের বিপরীতে ১৭০ জন, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে ১৯৭টি আসনের বিপরীতে ২৯৬ জন এবং সুনীতি-শান্তি হলে ২৫৬টি আসনের বিপরীতে ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন।

আসনের তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় অনেক কক্ষে একাধিক শিক্ষার্থীকে একই বিছানা ভাগাভাগি করতে হচ্ছে। কেউ কেউ মেঝেতে বিছানা পেতে রাত কাটাচ্ছেন। এতে ব্যক্তিগত পরিসরের অভাবের পাশাপাশি পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার ৯২২ জন শিক্ষার্থী হলের বাইরে থেকে পড়াশোনা করছেন। তাঁদের অনেকে বাড়ি থেকে যাতায়াত করেন, আবার অনেকে ক্যাম্পাসের আশপাশের মেসে থাকেন। এতে আবাসন ও যাতায়াতের ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগে থাকতে হচ্ছে তাঁদের।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং বিভিন্ন সময়ে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রাহাত আকন্দ মনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রায় সাত মাস পার হলেও বাইরে থাকার কারণে তাঁকে বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। সন্ধ্যা সাতটা বা আটটার পর বাইরে থাকলে নিরাপত্তা নিয়ে ভয় কাজ করে বলেও জানান তিনি।

রাহাত বলেন, বিভিন্ন জায়গায় ছিনতাই ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। কয়েক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক শিক্ষকের ছেলেকে ক্যাম্পাসের কাছেই হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

আবাসন সংকটের ভোগান্তি শুধু নতুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন, এমন শিক্ষার্থীদেরও হলের আসনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাইরোজ মাহি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দেড় বছর পার হলেও এখনো হলে আসন পাননি তিনি। তাঁর মতে, বিদ্যমান হলগুলোতে আসন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। আবাসন সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হলে তাঁদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম অবশ্য জানিয়েছেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়। তাই সব শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে নতুন ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলো চালু হলে সংকট কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন উপাচার্য। তিনি বলেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে চারটি হল নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটি হলে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা থাকবে। হলগুলো চালু হলে আবাসন সংকট থাকবে না; বরং অতিরিক্ত কক্ষও খালি পড়ে থাকতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০ একর আয়তনের নতুন ক্যাম্পাসে ১০ তলাবিশিষ্ট চারটি আবাসিক হল নির্মাণের কাজ চলছে। এসব হলের কাজ শেষ হলে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ৪ হাজার ২০৬টি আসন যুক্ত হবে।

নতুন হল নির্মাণের কাজ শেষ হলে আবাসন পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে হলগুলো কবে শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে আপাতত অতিরিক্ত ব্যয়, গাদাগাদি করে থাকা এবং নিরাপত্তার উদ্বেগ নিয়েই দিন কাটাতে হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীকে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন