- ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের সতর্ক করতে বা শাস্তি দিতে রেফারির হলুদ ও লাল কার্ড দেখানোর দৃশ্য বহুদিনের পরিচিত। তবে সেই চিরচেনা পদ্ধতিতে এবার প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগানোর চেষ্টা চলছে। উরুগুয়ের একটি ফুটবল ম্যাচে প্রচলিত হলুদ কার্ডের পরিবর্তে মুঠোফোনের মতো দেখতে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করে খেলোয়াড়কে সতর্ক করেছেন রেফারি। নতুন এই উদ্যোগ ফুটবলে কার্ড দেখানোর পদ্ধতি বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কোপা উরুগুয়ের ম্যাচে রেন্তিস্তাসের বিপক্ষে নাসিওনালের খেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ডিভাইসটি ব্যবহার করেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেইয়া। যন্ত্রটির পর্দায় প্রচলিত কার্ডের পরিবর্তে ডিজিটাল সংকেত দেখানো হয়। তবে এর মূল উদ্দেশ্য কেবল কার্ড দেখানোর ধরন বদলানো নয়; বরং মাঠে নেওয়া শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তগুলোর তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা।
বর্তমানে কোনো খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর পর রেফারিদের সাধারণত হাতে লিখে সংশ্লিষ্ট তথ্য নথিভুক্ত করতে হয়। পরে সেই তথ্য নির্ধারিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়। নতুন ডিভাইসটির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রশাসনিক কাজে সময় কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছেন এর উদ্ভাবকেরা।
প্রযুক্তিটি নিয়ে কাজ করছে ‘রেফে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাউরো সাকো শুক্রবার উরুগুয়ের রেডিও ‘এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেস’কে বলেন, ফুটবলে এখনো যেসব কাজ প্রচলিত পদ্ধতিতে করা হয়, সেগুলোর মধ্যে কার্ড দেখানোর পর তথ্য নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়াটিকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে চান তাঁরা।
সাকো ও তাঁর সহ-পরিচালক দিয়েগো দে লা পেনার মাথায় তিন বছরেরও বেশি আগে এই ধারণা আসে। বৃষ্টির মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে তাঁরা লক্ষ করেন, মাঠে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও রেফারিদের হাতে লিখে তথ্য সংরক্ষণ করতে হয়। পরে সেই তথ্য আবার ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিকল্প খুঁজতে গিয়েই ডিজিটাল কার্ডের ধারণাটি সামনে আসে।
নতুন যন্ত্রটি ম্যাচের বিভিন্ন ঘটনা সময়সহ নথিভুক্ত করতে পারে। এর মাধ্যমে উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাচের তথ্য জমা দেওয়ার কাজ সহজ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্রটি ব্যবহার করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রেফারি ভারেইয়া। তাঁর মতে, ডিভাইসটি হাতে ব্যবহার করা সহজ এবং এর সফটওয়্যারও দ্রুত সাড়া দেয়। তবে প্রচলিত হলুদ বা লাল কার্ড তুলে ধরার যে তাৎক্ষণিক দৃশ্যমানতা ও নাটকীয়তা রয়েছে, নতুন পদ্ধতিতে তার কিছুটা ঘাটতি আছে।
বিশেষ করে দর্শকদের কাছে কার্ডের সংকেত স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আগের একটি পরীক্ষায় সূর্যের আলোয় পর্দার লেখা বা সংকেত ঠিকমতো দেখা না যাওয়ায় উদ্যোগটি বাতিল করতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক ম্যাচেও গ্যালারিতে থাকা দর্শক ও টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের কেউ কেউ রেফারির সিদ্ধান্ত বুঝতে সমস্যায় পড়েন।
প্রকল্পটির আরেক পরিচালক দে লা পেনা জানিয়েছেন, এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ডিভাইসটির দৃশ্যমানতা আরও উন্নত করার কাজ চলছে। তাঁর মতে, মাঠে সরাসরি যন্ত্রটি দেখলে টেলিভিশনের তুলনায় ভালো বোঝা যায়। তবে দর্শক ও সম্প্রচারমাধ্যম উভয়ের কাছেই সংকেত স্পষ্ট করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
এ জন্য যন্ত্রটির চারপাশে এলইডি আলো যুক্ত করাসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের কথা ভাবছেন নির্মাতারা। তাঁদের লক্ষ্য, হলুদ ও লাল কার্ডের প্রচলিত রং যেন ডিজিটাল ব্যবস্থাতেও সহজে চেনা যায় এবং মাঠ ও টেলিভিশন দুই জায়গাতেই তা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।
সাকো জানিয়েছেন, প্রকল্পটির ব্র্যান্ড নিবন্ধনের পাশাপাশি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্ট নেওয়া হয়েছে। এর উন্নয়নকাজের সঙ্গে চীনে অবস্থিত একটি দল যুক্ত রয়েছে।
ডিজিটাল কার্ড ব্যবহারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ একে ফুটবলের আধুনিকায়নে নতুন পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ প্রচলিত কার্ডের বিকল্প হিসেবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ নিয়ে নানা রসিকতা ও মিমও তৈরি হয়েছে।
তবে সমালোচনা বা রসিকতাকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন না সাকো। তাঁর মতে, নতুন কোনো প্রযুক্তি চালু করতে গেলে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া আসবেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উদ্যোগটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রকল্পটির উদ্যোক্তারা আশা করছেন, প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হবে। তবে নতুন এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিক ফুটবলে চালু হবে কি না, তা নির্ভর করছে এর কার্যকারিতা, দৃশ্যমানতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর।
ডিজিটাল কার্ড শেষ পর্যন্ত প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের জায়গা নেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আপাতত মাঠের সিদ্ধান্ত দ্রুত নথিভুক্ত করা এবং রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবেই এগোচ্ছে প্রযুক্তিটি।