- ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসানো নয়, বরং রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পরও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণ না হলে পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিই আবার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্প্রতি নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। সেখানে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সংস্কার কার্যক্রম, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় বিএনপির অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক প্রশ্ন সামনে আনা হয়নি। তখন অগ্রাধিকার ছিল স্বৈরাচারী শাসনের পতন। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি আগের মতো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ফিরে আসে, তাহলে মানুষের আত্মত্যাগ ও প্রত্যাশার যথাযথ মূল্যায়ন হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
নিজের বক্তব্যে তিনি কর্নেল তাহেরের মৃত্যুর প্রেক্ষাপট, ২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার বিষয়গুলোও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কেবল একজন শাসকের বিদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী কাঠামো বদলানোও ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এনসিপির এই নেতা বলেন, সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসনের জবাবদিহি, পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং দুর্নীতি দমনে কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই বছরের এপ্রিলে বিভিন্ন অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বিএনপির নিজস্ব অবস্থান ও যুক্তি থাকতে পারে। তবে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে কি না, সেই প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে।
বিএনপি সরকারের খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের বিরোধিতা করেন না বলে পোস্টে উল্লেখ করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তবে তাঁর মতে, এসব কর্মসূচির পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করা জরুরি।
তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না হলে, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলে এবং প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত না থাকলে সাময়িক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সম্ভব হবে না।
সাধারণ মানুষের জীবিকা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয়টিও পোস্টে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, মানুষের রুটিরুজির ওপর আঘাত এলে কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে বিষয়ে নীরব থাকার নৈতিক ভিত্তি থাকে না। জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে কোনো দলের স্বার্থের কাছে বিসর্জন দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁর পোস্টে বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের একটি সুযোগ তৈরি করেছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে শুধু অতীতের শাসকদের নয়, বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরও দায় নিতে হবে।
তাঁর মতে, বিএনপির অতীত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি যেমন প্রয়োজন, তেমনি বর্তমানে ক্ষমতায় থেকে দলটি কী করছে, তারও হিসাব দিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের আত্মত্যাগের একক দাবিদার হতে পারে না; রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এ কথাও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
পোস্টের শেষাংশে ক্ষমতার দম্ভ এবং জনআকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী হতে পারে না। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সংস্কারের দাবি সামনে এসেছে, তা উপেক্ষা করে পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় ফিরে গেলে জনগণ আবারও জবাবদিহি চাইবে।
তবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এসব বক্তব্যের বিষয়ে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কি না, তা তাঁর দেওয়া পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি।