- ২০ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চিপের বাজারে এনভিডিয়ার একচ্ছত্র প্রভাব কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে অ্যামাজন। নিজেদের ক্লাউড সেবা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) মাধ্যমে ‘টর্চনিউরন’ নামে একটি টুল চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর সাহায্যে এআই নির্মাতারা কোড নতুন করে না লিখেই তাদের অ্যাপ্লিকেশন এনভিডিয়ার চিপের বদলে অ্যামাজনের নিজস্ব ‘ট্রেনিয়াম’ চিপে চালানোর সুযোগ পাবেন।
সোমবার টুলটি উন্মোচন করে অ্যামাজন জানিয়েছে, জনপ্রিয় এআই ডেভেলপমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক পাই-টর্চ ব্যবহার করে তৈরি অ্যাপ্লিকেশনগুলো ট্রেনিয়াম চিপে স্থানান্তর করা আরও সহজ হবে। এ জন্য কোডে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না; কেবল একটি কনফিগারেশন পরিবর্তন করেই অ্যাপ চালানোর ব্যবস্থা করা যাবে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু নিজেদের চিপের ব্যবহার বাড়ানোই নয়, এআই সফটওয়্যারের জগতে এনভিডিয়ার শক্তিশালী অবস্থানকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছে অ্যামাজন।
এআই মডেল তৈরি, প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার কাজে পাই-টর্চ বহুল ব্যবহৃত একটি উন্মুক্ত সফটওয়্যার কাঠামো। অ্যামাজনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৮৫ শতাংশ এআই অ্যাপ্লিকেশন পাই-টর্চের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে এই প্ল্যাটফর্মে সহজে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে পারলে ট্রেনিয়াম চিপের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
পাই-টর্চের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফেসবুকের হাত ধরে। ২০২২ সাল থেকে এটি লিনাক্স ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, এনভিডিয়া দীর্ঘদিন ধরে তাদের ‘কুডা’ সফটওয়্যার অবকাঠামোকে পাই-টর্চের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলেছে। এর ফলে এআই অ্যাপ্লিকেশন চালানোর ক্ষেত্রে এনভিডিয়ার গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ অনেক ডেভেলপারের কাছে স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে উঠেছে।
অ্যামাজনের টর্চনিউরন এই নির্ভরতা কমানোর একটি প্রচেষ্টা। পাই-টর্চের সঙ্গে পরিচিত ডেভেলপারদের জন্য নতুন টুলটি ব্যবহার করা সহজ হবে বলে দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে শুধু অ্যামাজন নয়, এএমডির জিপিইউ এবং অ্যাপলের চিপেও কনফিগারেশন পরিবর্তনের মাধ্যমে পাই-টর্চভিত্তিক অ্যাপ চালানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে এই বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
ট্রেনিয়াম চিপ তৈরি করা এডব্লিউএসের অ্যানাপার্না ল্যাবসের প্রযুক্তি সফটওয়্যার বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট কলিন ব্রেসের মতে, অ্যামাজনের বড় সুবিধা হলো চিপের পাশাপাশি পুরো ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ। তাঁর ভাষ্য, অন্য কোনো নির্দিষ্ট কম্পিউটিং সেবাদাতার ওপর নির্ভর করে পরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার বদলে এডব্লিউএসে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে উৎপাদন পর্যায় পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আগে থেকেই রয়েছে।
এডব্লিউএসের দাবি, একই ট্রেনিয়াম প্ল্যাটফর্মে এআই মডেলের প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ শেষে ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাজ—যাকে ইনফারেন্স বলা হয়—সম্পন্ন করা সম্ভব। এর সঙ্গে ক্লাউড অবকাঠামোর সমন্বয় থাকায় পুরো কাজের খরচ কমানো যেতে পারে। যদিও প্রতি টোকেনের হিসাবে তাদের সেবার দামই বাজারে সর্বনিম্ন, এমন দাবি করছে না অ্যামাজন।
নিজেদের দাবির পক্ষে এআইভিত্তিক ভয়েস প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিপগ্রামের উদাহরণ দিয়েছে এডব্লিউএস। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, পাই-টর্চের সমর্থন কাজে লাগিয়ে ট্রেনিয়ামে যাওয়ার পর ডিপগ্রাম প্রতি ডলারে আগের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি অডিও প্রক্রিয়াকরণ করতে পারছে। একই সঙ্গে উৎপাদন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্ভুলতাও বজায় রয়েছে বলে দাবি অ্যামাজনের। ডিপগ্রাম এআই ভয়েস প্রযুক্তির বাজারে ইলেভেনল্যাবসের প্রতিদ্বন্দ্বী।
তবে অ্যামাজনের পরিকল্পনা শুধু ডেভেলপারদের ট্রেনিয়াম চিপে স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি পাই-টর্চের মূল প্রকল্পেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে সফটওয়্যার কাঠামোটি কোনো নির্দিষ্ট নির্মাতার চিপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থাকে। এ লক্ষ্যে নিজেদের তৈরি কোড পাই-টর্চের মূল প্রকল্পে যুক্ত করার জন্য কাজ করছে তারা।
এ ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে এনভিডিয়ার পাশাপাশি এএমডি ও অ্যামাজনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী চিপ নির্মাতারাও সুবিধা পেতে পারে। ডেভেলপারদের জন্যও হার্ডওয়্যার বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে সফটওয়্যারকে বিভিন্ন চিপের উপযোগী করতে গিয়ে কনফিগারেশন জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কাও রয়েছে।
এআই চিপের বাজারে এনভিডিয়ার শক্তিশালী অবস্থানের পেছনে শুধু হার্ডওয়্যারের সক্ষমতা নয়, সফটওয়্যার ও ডেভেলপারদের দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাই-টর্চকে আরও হার্ডওয়্যার-নিরপেক্ষ করে তুলতে অ্যামাজন সফল হলে প্রতিযোগিতার চিত্র বদলাতে পারে। তবে এতে এআই নির্মাতারা সত্যিই কম খরচে বেশি বিকল্প পাবেন, নাকি নতুন প্রযুক্তিগত জটিলতার মুখে পড়বেন তা নির্ভর করবে টুলটির বাস্তব কার্যকারিতা ও ডেভেলপারদের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।