- ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণে প্রস্তাবিত ‘ফ্রেমওয়ার্ক অব ওয়ার্ল্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন স্ট্যান্ডার্ডস’, যা ‘বেইজিং এগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত, তাতে সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ।
এই সহযোগিতার আওতায় বাংলাদেশের আটটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন, যৌথ শিক্ষা কার্যক্রম চালু, বৃত্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং নতুন একটি কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি কারিগরি শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বিশ্ব কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা উন্নয়ন সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে বৈশ্বিক শিক্ষা কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগের রাতে সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শিক্ষা খাতে সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ নয়টি ক্ষেত্রে দুই দেশ একমত হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। যৌথ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী এবং চীনের শিক্ষা উপমন্ত্রী ওয়াং গুয়াংইয়ান সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
সমঝোতা অনুযায়ী, চীনের কারিগরি শিক্ষাক্রম, পাঠদান পদ্ধতি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের আটটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষার মান উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ ও উন্নত পরীক্ষাগার স্থাপনের পাশাপাশি চীনা মানদণ্ড অনুসরণ করে ডিপ্লোমা পর্যায়ের কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া দুই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘২+২’ ও ‘৩+১’ মডেলে যৌথ একাডেমিক কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দুই দেশে শিক্ষা গ্রহণ, ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
দুই দেশের সম্মত হওয়া প্রথম উদ্যোগটি হলো কারিগরি শিক্ষা, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও জাতীয় দক্ষতা সনদায়ন নিয়ে কাজ করতে একটি ‘বাংলাদেশ-চীন যৌথ টিভিইটি দল’ গঠন। টিভিইটি বলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণকে বোঝানো হয়।
দ্বিতীয়ত, চীনের কারিগরি সহায়তা, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে একটি আদর্শ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয় উদ্যোগের আওতায় চীনা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিদ্যমান কারিগরি কলেজগুলোর শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি ও সামগ্রিক কার্যক্রম মূল্যায়ন করে উন্নয়নের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চতুর্থ ক্ষেত্রে চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার সঙ্গে শিল্পকারখানার বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
পঞ্চম উদ্যোগে প্রকৌশল, উৎপাদন, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও সেবাসহ বিভিন্ন খাতে ‘চীনা ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা’ সমন্বিত প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে ভাষাগত দক্ষতার পাশাপাশি নির্দিষ্ট পেশায় কাজ করার উপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ষষ্ঠ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, স্বীকৃত সনদ, শিল্পকারখানায় ইন্টার্নশিপ এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা রয়েছে। সপ্তম উদ্যোগে বাংলাদেশি কারিগরি শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিত শিক্ষক বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচি চালুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অষ্টম ক্ষেত্রে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। নবম উদ্যোগের আওতায় কর্মসূচিগুলোর অগ্রগতি, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক সহযোগিতার ফলাফল পর্যালোচনায় একটি আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরাসরি সংযোগ তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা সহজ হবে।
একই সঙ্গে চীনা ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের পথ তৈরি করতে পারে।
তবে এসব পরিকল্পনার সুফল পেতে হলে সমঝোতার আওতায় গৃহীত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রশিক্ষণের মান এবং কর্মসংস্থানের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার কাঠামো ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে চীনের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এ সহযোগিতা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।